জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পোড়ে জনগণের শরীর

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২০

ডায়ালসিলেট ডেস্ক :: জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সময় এলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সংবাদের শিরোনাম হয়।

ওয়েবসাইটে সংস্থাটির মিশন হিসেবে লেখা আছে- ‘To create an enabling environment, efficient, well-managed and sustainable energy sector in Bangladesh for providing energy at just & reasonable cost, and protection of consumers interest & satisfaction through fair practice.’

ন্যায্যমূল্যে জ্বালানির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ভোক্তাদের স্বার্থসংরক্ষণ করে সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা তাদের মিশন হিসেবে লেখা থাকলেও বাস্তবে এ সংস্থাটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের স্বার্থসিদ্ধির অন্যতম এক মাধ্যম।

আমরা কখনোই দেখিনি এ সংস্থাটি ভোক্তার স্বার্থসংরক্ষণ করেছে বরং সরকার বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের যে অন্যায় ট্যারিফ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, সেটাকে ‘জায়েজ’ করাই এর দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এ সংস্থা এখন আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে যাচ্ছে। বলে রাখা ভালো গত ১০ বছরে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ছয়বার।

বাংলাদেশের ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করা নিয়ে আন্দোলন করা কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বাম দলগুলো বিইআরসির গণশুনানিতে নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকে। গত বছরের নভেম্বরে গণশুনানিতে বিএনপিও অংশ নিয়েছিল।

খুব শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও এ সংস্থার শুনানিতে কখনও সরকারের ইচ্ছার বাইরে কিছু হয়নি। কোনো পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ গ্রহণ করা দূরেই থাকুক, আংশিক পরামর্শ গ্রহণ করার নজিরও নেই।

তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এ লোকদেখানো গণশুনানির উদ্দেশ্য আসলে কী? এটা কি তাহলে করা হয় সবার অংশগ্রহণের একটা ‘আইওয়াশ’-এর মাধ্যমে সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেয়ার জন্য?

প্রতিবারের মতো এবারও জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি কমানোর কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বরাবরের মতো এবারও গণশুনানিতে এটা প্রমাণিত হয়েছে- এ মূল্যবৃদ্ধি আদৌ প্রয়োজনীয় নয়, বরং কিছু ব্যবস্থা নিলে কোনোভাবেই মূল্য বাড়ানোর দরকার নেই। কিন্তু সেদিকে সরকারের ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ যে থাকবে না, সেটি তথাকথিত গণশুনানির অভিজ্ঞতা থেকে একেবারেই স্পষ্ট।

গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতে ক্রমাগত দুর্নীতির যে ধারা চলেছে তার মাশুল মানুষ দিয়ে যাচ্ছিল বিগত বছরগুলোয় এবং আরও দিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতেও। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুতের ঘাটতি দেখিয়ে সরকার আপৎকালীন স্বল্প মেয়াদে ২-৩ বছর তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয়।

বলা হয়েছিল এরপর কয়লা এবং গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। সচেতন মানুষ অবশ্য সরকারের এ কথা বিশ্বাস করেনি, কারণ এ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করার আগে সরকার ইনডেমনিটি দেয়। ইনডেমনিটিই পূর্বাভাস দিয়েছিল, এ খাতে কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্থাপন করা হয়েছে একের পর এক নতুন কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। পরিকল্পনায় পেছনে পড়ে থাকল কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা নিয়েও আছে গুরুতর প্রশ্ন, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

ব্যাংক খাতে যেমন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হয়েছে, এ খাতের দুর্নীতির সঙ্গেও ঘটেছে তেমন খতনা। জ্বালানি খাতে যেহেতু সরকারের মনোপলি আছে তাই মানুষের আর কোনো বিকল্প ছিল না, জনগণের পকেট খালি করতে তাদের কোনো সমস্যাই হয়নি।

এ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে টাকা বানানো এত সহজ হয়ে গেছে, চাহিদা না থাকলেও তেলভিত্তিক নতুন কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন চলছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হুট করে ২ হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলেও প্রয়োজন না থাকায় এসব কেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ নিচ্ছে না।

এগুলোকে বসিয়ে রেখে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভাড়া দিয়েছে সরকার। গত বছর সব বিদ্যুৎকেন্দ্রকে শুধু কেন্দ্রের ভাড়া হিসেবেই সরকার দিয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছর এর পরিমাণ হবে ২০ হাজার কোটি টাকা।

গত বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, মূল্যবৃদ্ধি না করলে এ বছর এটি সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে। শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে না হলে ভর্তুকি তো থাকতই না, বরং এ খাতে উদ্বৃত্ত থাকত অনেক টাকা।

শুধু তাই নয়, ক্যাবের অর্থনীতিবিদ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম এবারের গণশুনানিতেই আমাদের জানিয়েছেন আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য- সরকার অব্যবস্থাপনা রোধ করতে পারলে গ্যাস খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমাতে পারে। সবকিছু বিবেচনায় নিলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি দূরেই থাকুক, মূল্য কমানো সম্ভব ছিল।

অনেক দেরি হলেও দেশে কয়েকটি বড় আকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। এগুলোর প্রকল্প ব্যয় যথারীতি সরকারের আর সব প্রকল্পের মতোই ন্যায্য ব্যয়ের কয়েকগুণ। শুধু এ লুটপাটই নয়, সমস্যা আছে আরও।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চলবে আমদানিকৃত কয়লায় এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পার্শ্ববর্তী দেশের এক বিশেষ কোম্পানির নিুমানের কয়লার ভাগাড় বানানোর অভিযোগ আছে। অথচ বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ উন্নত মানের কয়লার মজুদ আছে।

একটা কয়লানীতি নেই, এ অজুহাতে দেশের কয়লা উত্তোলন স্থবির হয়ে আছে। ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার কয়লানীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করে প্রায় শেষ করে এনেছিল। এরপর বর্তমান সরকার ১১ বছর ক্ষমতায় থাকলেও কয়লানীতি শেষ করেনি। এটা একেবারেই ইচ্ছাকৃত। কয়লা আমদানির নামে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অন্যায় মুনাফা দেয়াই হচ্ছে এর উদ্দেশ্য।

দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে গ্রীষ্মের কয়েক মাস- ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। বছরের অন্যান্য সময় এ চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। অথচ দেশে এখন ২০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত লোডশেডিং হয়। এর কারণ অপ্রতুল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি। কিন্তু সরকার এদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না; এ খাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে না। বিতরণ লাইন কারও হাতে তুলে দিয়ে সেটা থেকে তাকে নিয়মিত টাকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে না বলেই কি সরকারের এ অনীহা?

কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৯’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এতে জ্বালানির দাম বছরে একাধিকবার বাড়ানো যাবে, যেটা আগের আইনে ছিল একবার বাড়ানো যাবে।

২০১৭ সালে এক বছরে দু’বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে সরকার আইনি জটিলতায় পড়েছিল। তাই এবার সরকার আইন পরিবর্তন করেই আটঘাট বেঁধে নামছে। এটি প্রমাণ করে জ্বালানি খাতে উপর্যুপরি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা দেখা যাবে সামনে, মানে জনগণের জন্য খুব বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

যতই উন্নয়নের বুলি কপচানো হোক না কেন, দেশের অর্থনীতি যে প্রায় পুরোটা ভেঙে পড়েছে তার নানা আলামত এর মধ্যে স্পষ্ট। শুধু রেমিটেন্স ছাড়া দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির আর সব সূচক, যেমন রফতানি আয়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সব ক্ষেত্রেই দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিুমুখী।

এরই মধ্যে পত্রিকায় এসেছে গত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার কথা ছিল প্রথম ছয় মাসেই সরকার তার ৯০ শতাংশ নিয়ে নিয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকার চালানোয় টাকার টান পড়তে যাচ্ছে অচিরেই।

জ্বালানি খাত যেহেতু পুরোপুরি সরকারের মনোপলি, তাই এ খাত থেকে টাকা বানিয়ে নেয়া সরকারের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায়। এ আলোকেই দিব্য চোখে দেখা যায়, জনগণের জন্য খুবই খারাপ সময় আসছে সামনে।

বিদ্যুতের এ মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি যেমন জনগণের জীবনকে কঠিন করছে, তেমনি এর ফলে পণ্যের উৎপাদন মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে যে মূল্যস্ফীতি ঘটবে, সেটাও এ দেশের সিংহভাগ মানুষকে ভীষণ কষ্টে ফেলবে।

এভাবেই সরকারের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার মাশুল জনগণকে দিতে হচ্ছে। জনগণের স্বার্থের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা থাকলে সরকার এভাবে চলতে পারত না। একটা জবাবদিহিতাহীন সরকার জনগণের স্বার্থের দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না, এটা জানা; কিন্তু দেখার ব্যাপার হচ্ছে জনগণ কতদিন তার ওপরে ক্রমাগত এসব অত্যাচার মেনে নেয়।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য; সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি

0Shares