হবিগঞ্জে দেশীয় মদ বালতিতে ফেরি করে বিক্রি হয় যেখানে

প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০২০

ডায়ালসিলেট ডেস্কঃঃ হবিগঞ্জের হাওরবেষ্টিত আজমিরীগঞ্জবাসীর কাছে দেশীয় মদ নিত্যসঙ্গী। সন্ধ্যা হলেই এখানে হাড়ি, বালতিতে ফেরি করে চলে এসব মদ বিক্রি। শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, এখানে উপজেলা সদরেও এসব মদ বিক্রি হয় অবাধে। এটি ওই উপজেলাবাসীর কাছে দীর্ঘদিনের চিত্র।

প্রতিদিনই তারা এমন চিত্র দেখে আসছেন। বিভিন্ন সময় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে এসব মদ কারবারিদের গ্রেফতার করলেও তাতে তেমন কোনো ফল  মেলেনি।

শুধু এ উপজেলাতেই নয়, এসব মদ আসছে পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা এবং কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলা থেকে। বর্ষায় নৌকায় এবং শুষ্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলে করে তা হোম ডেলিভারিও দেয় ব্যবসায়ীরা।

জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, চোলাইমদ তৈরির সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মতিউর রহমান খানের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে উপজেলার শিবপাশা ইউনিয়নের পশ্চিমভাগ মুচিবাড়ি থেকে ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হল- ওই গ্রামের মৃত মুকদেবের মেয়ে সৌমিতা রবিদাস (৫০) ও মৃত বছন রবিদাসের মেয়ে লিলিমা রবিদাস (২১)। এছাড়া নদীপথে চোলাইমদ পাচারকালে বদলপুর ইউনিয়নের পাহারপুর চরেরহাটি গ্রামের শ্যাম দাসের ছেলে সৈকত দাসকে (২৭) আটক করে পুলিশ। সৈকতের কাছ থেকে ২৮৮ লিটার চোলাইমদ জব্দ করা হয়। তাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অপর দুইজনকে মাদক আইনে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সৈকত জানায়, ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সে লাখাই উপজেলা থেকে নৌকাযোগে মাদক বহন করে পাহাড়পুর বাজারে পৌঁছে দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় আজমিরীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিরাট উজানপাড়া গ্রামের সঈদ মিয়ার ছেলে চুরি-ডাকাতিসহ কয়েকটি মামলার পলাতক আসামি সাজু মিয়ার সঙ্গে।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মতিউর রহমান খান জানান, এখানে দীর্ঘদিন ধরেই চোলাইমদ তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে চোলাইমদ তৈরির কারখানা আবিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে মদ তৈরিতে জড়িতদের সাজা দেয়া হয়েছে। কারখানাটিও ধ্বংস করা হয়েছে।

আজমিরীগঞ্জের সাংবাদিক বাদল ব্যানার্জি বলেন, ফোন দিলেই নৌকা বোঝাই করে মদ নিয়ে আসে মাদক কারবারিরা। অনেক সময় দেশি মদের সঙ্গে বিদেশি মদ ও ইয়াবাও হোম ডেলিভারি দেয়া হয়। অনেক দিন ধরে তা চলে আসছে। সন্ধ্যা হলেই এখানে চোলাইমদের অবাধ বেচাকেনা চলে। রাস্তায় রাস্তায় মদ্যপ মানুষ সন্ধ্যা নেমে এলেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।

তিনি জানান, প্রশাসনের তরফ থেকে প্রায়ই অভিযান চালালেও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর মাদকের অবাধ বিকিকিনির কারণে এখানে চুরি ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও নিয়মিতই ঘটছে। অনেকেই চুরি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেই এমন চিত্র দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলার কিছু প্রভাবশালী চক্র। বর্ষায় কুশিয়ারা নদীতে চলাচল করা লঞ্চের মাধ্যমেও মাদক সরবরাহ হয়। কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মারকুলি বাজার পর্যন্ত মাদক পাচারের নিরাপদ রুট এ কুশিয়ারা নদী।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার শিবপাশা, শৌলড়ি, কাকাইলছের, বদলপুর, পাহাড়পুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে এসব দেশি মদ তৈরি করা হয়। বাড়ির নারীরা এসব মদ তৈরি করেন। সরবরাহের কাজ করেন পুরুষরা।

বদলপুর বাজারের এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মদ ও মাদকের অবাধ বিক্রির বিষয়টি পুলিশের জানা থাকলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। হাওরাঞ্চলের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অভিযানের জন্য পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই মাদক কারবারিরা পালিয়ে যায়। বদলপুর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি হলে মাদক বেচাকেনা কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

0Shares