গোষ্ঠীস্বার্থে সেবাবঞ্চিত সিলেটের যাত্রীরা

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ৯:৪১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০২০

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::

দেশের সবকটি বিভাগে নির্বিঘ্নে বিআরটিসির বাস চলাচল করলেও সিলেটবাসী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যাত্রীসেবার লক্ষ্যে সিলেটে বাস সার্ভিস শুরু হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধায় বারবার এই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সিলেট-মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ ডিসেম্বর সিলেট থেকে মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জ রুটে বিআরটিসির বাস সার্ভিস উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দুই রুটে ১২টি বাস চলাচল করার কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে চারটি বাস চালু করার ঘোষণা দেয় বিআরটিসি। উদ্বোধনের পর থেকেই এই দুই রুটে বিআরটিসির বাস চলাচলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। গত ২৭ ডিসেম্বর বাস চলাচল শুরুর দিনে তারা বাধা দেন। তারা বিআরটিসির কাউন্টারে তালা ঝুলিয়ে দেন। হামলা করেন বিআরটিসির ডিপো ব্যবস্থাপকের ব্যবহৃত জিপে। এ সময় বিআরটিসির কয়েকজন কর্মচারী মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কাউন্টার থেকে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা এবং একটি ল্যাপটপ লুটে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বিআরটিসির সংশ্লিষ্টরা। এই হামলার পর রুটগুলিতে বাস সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। তবে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এই দুই রুটে বাস চলাচল শুরুর সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এর আগে গত বছরের জুনে সিলেট-সুনামগঞ্জ রুটে বিআরটিসির বাস সার্ভিস চালুর পর পরিবহন ধর্মঘট ডাকেন বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। ভাঙ্গা হয় বিআরটিসি বাসের গøাস, আক্রান্ত হন চালক। পরে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যৌথসভায় সমঝোতার ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয় ধর্মঘট। এরপর এই বিআরটিসি বাসের সংখ্যা কমে, কমে যায় ট্রিপের সংখ্যাও। একই ঘটনা ঘটে গত বছরের নভেম্বরে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ সড়কে বিআরটিসির বাসসেবা চালুর পরও। ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্ট এবং নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে পর্যটকদের যাতায়াত সহজতর করতে এ বাস সার্ভিস চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত বাস ও সুযোগ সুবিধা থাকার পরও সিলেটের সকল রুটে বাস দিতে পারছে না বিআরটিসি। বর্তমানে এ দুটি রুটে বিআরটিসির মাত্র ৮টি বাস চলাচল করছে।

সিলেট নগরবাসী বলছেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিআরটিসির বাস চলছে। তারা কম খরচে সেবা পেলেও সিলেটবাসী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও বিআরটিসির আইনে দেশের যে কোনো রুটে বাস চলাচল করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের ২২ ধারায় যাত্রী ও পণ্যবাহী মোটরযান পরিচালনার ক্ষমতার বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সড়ক পরিবহন আইন -২০১৮ এ যা কিছুই থাকুক না কেন, বিআরটিসি জনস্বার্থে সারা বাংলাদেশের যে কোনও রুটে যাত্রী ও পণ্যবাহী মোটরযান পরিচালনা করতে পারবে। জনস্বার্থে গণপরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাও পরিচালনা করতে পারবে।’ যদিও পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, বিআরটিসি রুট মেনে বাস চালায় না। সিলেটের লোকাল রুটে পর্যাপ্ত বাস থাকা সত্তে¡ও তারা রাস্তায় বিআরটিসির বাস নামাচ্ছেন।

বিআরটিসি সিলেট ডিপো সূত্রে জানা যায়, সিলেট ডিপোতে একদম নতুন ১০টি ডাবল ডেকার বাস পড়ে আছে। ছাতক, জাফলংসহ সিলেট নগরে বাস পরিচালনায় যাত্রীদের দাবি সত্তে¡ও মালিক সমিতির চাপে তারা কোথাও বাসগুলো নামাতে পারছেন না।

এ ব্যাপারে বিআরটিসি সিলেট ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার মো. জুলফিকার আলী বলেন, ‘যাত্রীদের যাতায়াতকে সহজ, নিরাপদ ও কম ব্যয়বহুল করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের কাছে প্রতিদিন অসংখ্য ফোন আসে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অন্যান্য রুটে বাস সার্ভিস চালুর জন্য। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বাসও আছে। অনেকগুলো নতুন দুতলা বাস ডিপোতে পড়ে আছে। কিন্তু সড়কে তুলতে পারছি না।’ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধাই এর মূল কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ জিয়াউল কবির পলাশ বলেন, ‘বিআরটিসি বাস তার নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করে না। আমরা বলেছিলাম লোকাল রুটে যাতে তারা কোনো বাস না ছাড়ে। কারণ এসব রুটে আমাদের পর্যাপ্ত বাস রয়েছে। তারা বিভাগের বাইরে বাস চালালে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থই বিআরটিসির বাস চলাচলে প্রধান বাধা বলে মনে করেন সিলেটের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিআরটিসি দেশের যে কোনো পরিবহন থেকে বেশি উন্নত সেবা প্রদান করে। কিন্তু একটি মহলের চাপে বারবার এই সেবা ব্যাহত হচ্ছে।’ বিভাগজুড়ে সর্বত্র বাস চলাচলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন সবকিছুতে প্রতিযোগিতা চলছে। সড়কে যারা ভালো সেবা দেবে তারাই টিকে থাকবে। বিআরটিসির বাসের মান খারাপ হলে মানুষ তা ত্যাগ করবে। কিন্তু মানুষ এখন বিআরটিসির সেবা চাইছে। সড়কে যে নৈরাজ্য চলছে তা বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার সামি হায়দার বলেন, ‘নগরে বিআরটিসি বাস চালু হলে আমরা উপকৃত হব। কম খরচে ভালো সেবা পাব।’ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস চললেও সিলেটে কেন চলবে না- এই প্রশ্ন রাখেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বাপন চক্রবর্তীও নগরে বিআরটিসির বাস চালুর দাবি জানান।

নগরে বাস চালুর প্রসঙ্গে বিআরটিসি সিলেট ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার মো. জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমরাও চাইছি সিলেট নগরে বিআরটিসির বাস চলুক। আমরা নগরবাসীকে ৫-১০ টাকায় ভালো সেবা দিতে চাই।’

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ৩টি রুট ঠিক করে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান জুলফিকার আলী। চিঠি পাওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে মধ্যরাতে নগরে বিআরটিসির দুতলা বাস চালানো হয়। বিদ্যুতের তারে লাগার আশঙ্কা থেকে এটি করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত রুটগুলোতে বিদ্যুতের ক্যাবল নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

জুলফিকার আলী বলেন, ‘নগরের সড়কগুলোর সংস্কার কাজ চলছে। তাই আমরা বাস নামাতে পারছি না। আশাকরি সংস্কার কাজ শেষ হলে আমরা বাস নামাতে পারব।’

0Shares