প্রস্তাবিত সড়ক দখল করে ডিএসসিসির বহুতল মার্কেট

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

ডায়ালসিলেট ডেস্ক;;

পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের প্রস্থ ১৯ ফুট। এটিকে ৬০ ফুটে উন্নীত করতে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) সুপারিশ করা হয়েছে। ২০১০ সালে এটি গেজেটভুক্তও হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) স্বয়ং প্রস্তাবিত ওই সড়কের অন্তত ১৫ ফুট দখল করে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করছে।

চানখারপুল থেকে চকবাজার হয়ে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটারের সড়কটি পুরান ঢাকার অন্যতম প্রধান সড়ক। চকবাজার, বেগমবাজার, মৌলভীবাজার, আলু বাজারে যাতায়াতের প্রধান পথ এটি। পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারও এ সড়কে। ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য পুরাতন কারাগার ঘিরে প্রকল্প চিন্তা করছে সরকার। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও রয়েছে।

প্রস্তাবিত এ সড়কের চানখারপুল মোড় সংলগ্ন অংশ না ছেড়ে বহুতলা মার্কেট নির্মাণ কাজ করছে ডিএসসিসি। বেজমেন্টসহ ইতোমধ্যে একতলা নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। স্থায়ী এ অবকাঠামো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করায় জনঘনত্বপূর্ণ পুরান ঢাকার জরুরি সড়কটি প্রশস্তকরণ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ব্যাপারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পক্ষ থেকে নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে ডিএসসিসির মার্কেট নির্মাণ করতে চিঠি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৮ নভেম্বর রাজউকের সচিব শামীমা মোমেন স্বাক্ষরিত চিঠি ডিএসসিসিকে পাঠানো হয়। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওই চিঠি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে প্রেরণ করেন। ওই দপ্তর থেকে চিঠি নগর পরিকল্পনা বিভাগে মতামতের জন্য প্রেরণ করা হয়। ইতোমধ্যে দুই মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও ডিএসসিসি থেকে রাজউককে কোনো জবাব দেয়া হয়নি।

আরও জানা যায়, চানখারপুল মোড়ে ডিএসসিসির বহুতল মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরুর পর্যায়েও দু’দফা চিঠি দেয় রাজউক। এরপরও সেসব আমলে নেয়নি ডিএসসিসি। রাজউক থেকে প্রথম চিঠি দেয়া হয় ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল। আর দ্বিতীয় দফা চিঠি দেয়া হয় ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। এরপরও ডিএসসিসি প্রস্তাবিত সড়ক দখল থেকে পিছপা হয়নি। সর্বশেষ চিঠি দিলেও ওই চিঠির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব অনুভব করছে না ডিএসসিসি।

রাজউকের চিঠিতে বলা হয়েছে, পুরান ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। রাজউক সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের চিন্তা করছে। সে লক্ষ্যে পুরান ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যানজট নিরসনের কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এমন একটি পরিকল্পনা পুরান ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসন। আর এ লক্ষ্যেই রাজউক পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ এবং পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই। এছাড়া খসড়া ড্যাপে পুরান ঢাকার রি-ডেভেলপমেন্টের নীতিমালা সংযুক্ত করা হয়েছে। জনগণের সম্মতিতে পুরান ঢাকায় একাধিক রি-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ভবিষ্যৎ এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনঘনত্বপূর্ণ পুরান ঢাকার চানখারপুল থেকে চকবাজার হয়ে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুরান ঢাকার অন্যতম প্রধান সড়ক হওয়ায় এ সড়কটি এখনই প্রশস্ত করা জরুরি।

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজউকের তৃতীয় চিঠি পাওয়ার পর নাজিম উদ্দিন রোডের প্রশস্ততা মেপেছে ডিএসসিসি। সেখাতে তারা ওই সড়কের প্রশস্ততা ২৬ ফুট পেয়েছে। আর ডিএসসিসি মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে আরও ১০ ফুট জায়গা ছেড়ে। বিদ্যমান বাস্তবতায় দুপাশের ১০ ফুট করে ২০ ফুট এবং বিদ্যমান ২৬ ফুট যোগ করলে ৪৬ ফুটের প্রশস্ত সড়ক করা সম্ভব। এটিও বর্তমান বাস্তবতায় পুরান ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে বাস্তব ভিত্তিক জবাব দেয়ার জন্য প্রস্ততি নিচ্ছে ডিএসসিসি।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং স্মার্ট সিটি বিশেষজ্ঞ ড. ওমর-বিন-আব্দাল আজিজ বলেন, ‘চানখারপুল থেকে চকবাজার হয়ে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করা খুবই জরুরি। প্রায় দুই কিলোমিটার এ সড়কটি চকবাজার, বেগমবাজার, মৌলভীবাজার এলাকার চলাচলের প্রধান সড়ক।’

তিনি বলেন, ‘যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি একটি সমন্বয়হীন কাজ বলে মনে হয়েছে। ডিএসসিসি নকশা অনুমোদন করে মার্কেট নির্মাণ কাজ শুরু করেছে, গেজেটভুক্ত পরিকল্পনা না দেখেই। অন্যদিকে শুরুর পর্যায়ে রাজউকও বাধা দেয়নি। নকশা চূড়ান্ত করে ঠিকাদার নিয়োগ, বেজমেন্টের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর রাজউক থেকে চিঠি আসে। তখন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন আমাকে ডেকে ঘটনাটি বলেছিলেন। আমি এ এলাকার সড়কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলাম। তখন তিনি বলেছিলেন, এত টাকা খরচ করে কিভাবে সড়ক প্রশস্ত করব।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি সরকারি সংস্থা হিসেবে ডিএসসিসি সরকারি গেজেটভুক্ত পরিকল্পনা অমান্য করতে পারে না, এটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু এখানে মূলত সমন্বয়হীনতার কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে। রাজউক সড়ক প্রশস্ততার যে কথা বলছে, সেটার যৌক্তিকতা রয়েছে এবং ডিএসসিসির বেজমেন্টসহ একতলা মার্কেটও একটি বাস্তবতা। আমি ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ এবং মেয়রের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করব। আশা করি, রাজউকের সঙ্গে একটি সমন্বয় সভা করে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করে নিতে পারব। কেননা, আমরাও বাসযোগ্য শহর গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছি, রাজউকের প্রস্তাবনাও একই উদ্দেশ্যে। সেহেতু, এটির সমাধান করা সম্ভব।’

এ প্রসঙ্গে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ড্যাপ প্রকল্পের পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘পুরান ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চায় রাজউক। আর এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীরও বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। সে কারণে রাজউক পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করে বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। কোনো এলাকার সড়ক না থাকলে তো সেখানে কোনো উন্নয়নই ফলপ্রসূ হয় না। এজন্য ২০১০ সালের গেজেটভুক্ত নাজিমউদ্দিন রোড থেকে চকবাজার হয়ে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত প্রশস্ত করা খুবই জরুরি। এটা ছাড়া পুরান ঢাকার বিকল্প তেমন কোনো সড়ক নেই।’

তিনি বলেন, ‘ওই সড়কে বেসরকারি পর্যায়ে যারা বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছে, তারা সবাই নির্ধারিত পরিমাণ জায়গা ছেড়েই ভবন নির্মাণ করেছে। কেননা, তারা রাজউকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বা নকশা অনুমোদনের আবেদন করলে ওই পরিমাণ জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণের শর্ত দেওয়া হয়েছে। গেজেটভুক্ত পরিকল্পনা থাকার পরও ডিএসসিসি সেটা না মেনে মার্কেট নির্মাণ ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। পুরান ঢাকার স্বার্থে ডিএসসিসিকে এ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে ভাবতে হবে।’

0Shares