শাল্লায় তাণ্ডব : পূর্বশত্রুতার প্রতিশোধ নিতেই হামলা

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ১২:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২১

ডায়ালসিলেট ডেস্ক;:

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের অনুসারীদের হামলার ঘটনায় শাল্লা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) সন্ধ্যায় শাল্লা থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় কয়েকজনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৬০/৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে পুলিশ মামলার স্বার্থে বাদী ও বিবাদীদের নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন শাল্লা উপজেলার কৃতী সন্তান র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও মন্দির পরিদর্শন করে হামলাকারীদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন। পরে তিনি গ্রামের স্কুল

মাঠে গ্রামবাসীদের উদ্দেশে কথা বলেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেন। এ সময় গ্রামবাসী ২৪ ঘন্টার মধ্যে মামুনুলের অনুসারীদের বিচার দাবি করেন। তারা ‘মন্দিরে হামলা কেন, বিচার চাই বিচার চাই’ স্লোগান দেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক সাম্পদায়িক সন্ত্রাসীদের হাত গুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে জানান। তিনি হামলাকারীদের তথ্য ও নাম-ঠিকানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দিতে অনুরোধ জানান। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন পয়েন্টে র‌্যাব ও পুলিশ টহল দিচ্ছে। থমথমে গ্রামে মুখ ভার করে নিজ নিজ ঘরে বসে আছেন গ্রামবাসী। তারা ২৪ ঘন্টা আগের তাণ্ডবের কথা ভেবে আতঙ্কিত ছিলেন। এ সময় গ্রামবাসী হামলার পেছনের ঘটনা এই প্রতিবেদককে অবগত করেন। গতকাল বুধবার সকালে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে ফেসবুকে ‘কটুক্তি’ করে লেখার জেরে তার অনুসারীরা নোওয়াগাঁও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। ভয়ে গ্রামবাসী পালিয়ে গেলে তারা গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। গ্রামের অন্তত ৮০টি ঘর ভাঙচুরসহ লুটপাট করা হয়। ৬টি মন্দিরও ভাঙচুর করা হয়। গ্রামবাসী জানান, মামুনুলকে কুটুক্তির অভিযোগ ছিল ছুতো। এ হামলার পেছনে ছিল অন্য ঘটনা। গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অনীল চন্দ্র দাসের ছেলে অমর দাস বলেন, ‘গত জানুয়ারি মাসে হামলাকারী গ্রাম চণ্ডিপুরের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া গুছাখাই জলমহাল ইজারার কল্যাণে সেচযন্ত্র লাগিয়ে মৎস্য আহরণ করেন। ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী সেচ দিয়ে মাছ ধরার নিয়ম নেই। তাছাড়া গ্রামবাসী এই জলমহালের পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করেন। তারা স্বাধীন মিয়াকে বিল না সেচে নীতিমালা মেনে মৎস্য আহরণের অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি তা না মেনে সেচে মাছ ধরার চেষ্টা করলে আমি ও গ্রামের ঝুমন দাস আপন প্রতিবাদ করি। গত ১৮ জানুয়ারি স্বাধীন মিয়ার বিরুদ্ধে এ নিয়ে ভিডিও লাইভে প্রতিবাদ করে প্রশাসনিক দৃষ্টি কামনা করি। এ ঘটনায় প্রশাসন স্বাধীন মিয়ার সেচ যন্ত্রাংশ জব্দ করে এবং তাকে আর্থিক জরিমানা করে। তখন ঝুমন দাস আপনসহ গ্রামবাসীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন স্বাধীন। গ্রামবাসী মনে করছেন, এ ঘটনার জের ধরেই সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে স্বাধীন মিয়া, ফক্কন মিয়াসহ একটি চক্র সহজ-সরল গ্রামবাসীর ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়।’ মুক্তিযোদ্ধা জগৎচন্দ্র দাস ও অনিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা স্বাধীন মেম্বারের বিল সেচের প্রতিবাদ করায় সে প্রতিশোধ নিয়েছে। তাই বেছে বেছে আমাদের সাতজন মুক্তিযোদ্ধার ঘরবাড়ি তছনছ করিয়েছে ও লুটপাট করিয়েছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলে বলে- আমাদের বড় হুজুরের অসম্মান করছিস এ কারণে হামলা করেছি। এই স্বাধীন মিয়া গত ১৫ মার্চ হেফাজতের সমাবেশে বিশাল লোকবল নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।’ ঝুমন দাসের স্ট্যাটাস : গত ১৫ মার্চ হেফাজত নেতা মামুনুল হক দিরাই উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে বক্তব্য দেন। সেখানে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলেন তিনি। মোদীর সমালোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদেরও কটাক্ষ করেন মামুনুল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নোওয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ‘আপত্তিকর’ একটি স্ট্যাটাস দেন। এ ঘটনা লুফে নেয় চতুর ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়াসহ তার চক্র। তারা নাচনী, চণ্ডিপুর, সরমঙ্গল, সন্তোষপুর, ধনপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর থেকে কয়েক হাজার মুসলমানকে উত্তেজিত করে হামলায় প্রলুব্ধ করে। তারা লাঠিসোঁটা, দা, রামদা, কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বুধবার সকালে নোওয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলাযাত্রার ভিডিও লাইভ করে এবং তারা মামুনুলের ভক্ত ও মামুনুল হকের জন্য রক্ত দিতেও প্রস্তুত বলে মন্তব্য করে। ওই লাইভে তারা নোওয়াগাঁও গ্রামে লুটপাট ও কোটি টাকার ক্ষতি করেছে বলে নিজেরাই বক্তব্য দেয়। যদিও এর আগে মঙ্গলবার রাতেই গ্রামবাসী ঝুমন দাস আপনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন। পুলিশ তাকে বুধবার ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। এদিকে ঝুমনের আইডি হ্যাক হয়েছে উল্লেখ করে তার স্ত্রী সুইটি রাণী দাস বলেন, ‘আমার স্বামীর আইডি হ্যাক হয়েছে। যারা হামলা করেছে তারাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে এ কাজ করছে। আমরা এখনও আতঙ্কিত। খাটের নিচে লুকিয়েও আমি রেহাই পাইনি। আমাকে বের করে স্বর্ণ, টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে। তার (ঝুমনের) স্ত্রী জেনে হাতে আঘাত করেছে।’ ঘটনাস্থলে র‌্যাব মহাপরিচালক, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ : র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় হেলিকপ্টারে করে গ্রামে আসেন। এ সময় তিনি গ্রামে প্রবেশ করার পরই নোওয়াগাঁও গ্রামের মানুষজন বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা ‘মামুনুলের বিচার চাই, মন্দিরে হামলা কেন, বিচার চাই বিচার চাই’ স্লোগান দেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক গ্রামে প্রবেশ করে অন্তত ২০টি বাড়িঘর দেখেন। এ সময় হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী। র‌্যাব মহাপরিচালক মন্দির, ঘরবাড়ি, হারমোনি, নলকূপসহ বিভিন্ন উপকরণ তছনছ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে জনান, এ ঘটনায় দায়ীদের কঠোর বিচার হবে। পরে গ্রামের স্কুলমাঠে বক্তব্য দেন র‌্যাবের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজা, রাধারমণের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে এমন ঘটনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। যারা এ হামলায় জড়িত তাদের কালো হাত গুড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা জঙ্গিবাদ নির্মূল করেছি। আপনারা ধৈর্য ধরুন, এ ঘটনার বিচার হবেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনারা ভয় পাবেন না। আপনারা যতদিন চান ততদিন গ্রামে র‌্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্প থাকবে। হামলা ঠেকানোর চেষ্টা : যখন নাচনি গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে নোওয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালানো হয়েছিল, তখন সেই শব্দ শুনে আতঙ্কিত হন গ্রামবাসী। এ সময় গ্রামবাসী পুলিশের সহযোগিতা চাইলেও পুলিশ সঠিক সময়ে আসেনি বলে জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎচন্দ্র ও অনিল চন্দ্র দাস। তবে এ সময় দারাইন বাজারে যখন কালিমন্দির ভাঙচুর করে হেফাজতের উগ্র সমর্থকরা, তখন কাশিপুর গ্রামের কৃষক রমজান আলী, সহিবুর রহমান ও বীর আলমসহ কয়েকজন হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদেরকে লাঞ্ছিত করে হামলাকারীরা বাজারের কালিমন্দির ভেঙে তাদের হামলা শুরু করে। তারা নোওয়াগাঁও গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামের বাড়িঘর তছনছ করে। বীর আলম বলেন, ‘আমি শ্রমিক মানুষ। যারা হামলায় অংশ নিয়েছে তারা সবাই পরিচিত। যেখানে হামলা করেছে তারাও আমাদের পরিচিত। হামলা যাতে না করে হাতে-পায়ে ধরে আমি অনুরোধ করেছিলাম। তারা মানেনি। আমাদের ঠেলে গিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে হামলা চালায়।’ হামলার শিকার গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের বড় হুজুরকে (মামুনুল হক) অসম্মান করায় আমরা মর্মাহত। হিন্দু ভাইয়েরা দোষীকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরও যারা হামলা করেছে তারা সাম্প্রদায়িক ও প্রকৃত খারাপ মানুষ। এ ঘটনা আমি মেনে নিতে পারছি না। আমি তাদের বিচার চাই।’ ছবি ও ভিডিও ভাইরাল : নোওয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনায় বিভিন্ন আইডি থেকে ফেসবুক লাইভ করে হামলাকারীরা। তারা নিজেদেরকে মামুনুল হকের ভক্ত বলে দাবি করেন। তার জন্য রক্ত দিতেও কসুর করেন না বলে মন্তব্য করেন তারা। তারা হামলা চালিয়ে চলে যাওয়ার সময় পুলিশ, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তখন সশস্ত্র হামলাকারীদের সঙ্গে তারা কথা বলেন। এ সময় কয়েকজন লোকের মাথায় হেফাজতের ব্যাজ বাঁধা ছিল। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার এমন ভিডিও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে হামলাকারীদের ছবি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এগুলো থেকেই হামলাকারীদের পরিচয় উদ্ধার সম্ভব বলে জানান গ্রামবাসী। ঘটনাস্থলে বিভিন্ন সংগঠন : এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল হুদা মুকুট গ্রামবাসীর সঙ্গে টেলিকনফারেন্সে কথা বলে ২ লাখ টাকা অনুদানের ঘোষণা দিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ইমন বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্রামবাসীকে সান্ত্বনা দিয়ে এসেছেন। এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতিকারীদের সরকার কঠোর বিচার করবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। মামলা : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় শাল্লা থানায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী ও বিবাদীদের সম্পর্কে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওসি নাজমুল হক। মামলায় দোষীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার নেই। পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মামলার স্বার্থে বাদী ও বিবাদীদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তবে আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কেউ রেহাই পাবে না।’

0Shares