মাদকের নেশাকেও হার মানায় টিকটক আসক্তি

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২১

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::শুটিং হচ্ছে। রাস্তায়, ছাদে। যত্রতত্র। এমনকি বাসায়, বারান্দায় বসে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ভিডিও। বিভিন্ন গানের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে নিজের অঙ্গভঙ্গি। ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপে আপলোড করা হচ্ছে। ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। অলস সময় কাটানো মানুষ তা দেখছেন।

মানহীন এসব ভিডিওতে বিপথগামীও হচ্ছেন অনেকে। রাতারাতি জনপ্রিয় হতে টিকটক, লাইকি বেছে নিচ্ছেন এক শ্রেণির মানুষ। টিকটককে কেন্দ্র করে সংসার ভাঙছে। আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এমনকি ঘটেছে হত্যাকাণ্ডও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই টিকটক ভিডিও এক ধরনের নেশা। এই নেশা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকের চেয়ে ভয়াবহ। ভার্চ্যুয়াল এই নেশায় আক্রান্ত হয়ে অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাচ্ছেন।

টিকটক নির্মাতারা বলছেন, দেশে ভালো কোনো ফিল্ম তৈরি হচ্ছে না। ফিল্মোর বাজার মন্দা দীর্ঘদিন থেকেই। ইচ্ছে থাকলেও অনেকে অভিনয়ে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না। এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাচ্ছেন। এমনকি ফিল্মের একসময়ের অনেক পরিচিতমুখও এখন টিকটকে সক্রিয়। মূলত কাজ না পেয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন তারা। টিকটকে অভিনয় করে অনেকেই নিজেকে অভিনয় শিল্পী, সেলিব্রেটি ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই শ্রেণিটাকে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে নারী পাচারকারী চক্র। গবেষকরা বলছেন হতাশা থেকে সাধারণত ফেসবুকে বেশি বেশি নিজের ছবি আপলোড করা হয়। একইভাবে হতাশা থেকেই অনেকে টিকটকের মতো বিশেষ অ্যাপসের প্রতি আসক্ত হচ্ছেন। টিকটক নির্মাতাদের অনেকেই অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করেন। নানা অপরাধেও জড়িত অনেকে। মাদক ও পতিতাবৃত্তির মতো অপকর্মে লিপ্ত। যে কারণে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের আকৃষ্ট ও নিজের পরিচিতির জন্য অনেক মেয়েরা স্বেচ্ছায় এই মাধ্যমে সক্রিয়।
ভারতের কেরালায় বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর এ বিষয়ে সক্রিয় দেশের গোয়েন্দারা। টিকটকে স্টার বানানোর প্রলোভন দিয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনা এর আগে দেশেও ঘটেছে। টিকটক করতে গিয়ে অন্যান্য টিকটক নির্মাতাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো গাজীপুরের টঙ্গির পূর্ব থানা এলাকার সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রীর। টিকটক স্টার বানানোর প্রলোভন দিয়ে ওই ছাত্রীকে ঢাকার গেন্ডারিয়ার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে চার-পাঁচ জন তাকে ধর্ষণ করে। ঘটনাটি ঘটেছিলো গত বছরের ২৩শে ডিসেম্বর। এ ঘটনার পর পর শিশির ও জুনায়েদ নামে দুই টিকটক নির্মাতাকে ঢাকার ওয়ারী থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মূলত কিশোর গ্যাং’র সদস্যরাই এসব অপকর্মে জড়িত। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর তরুণদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এসব গ্রুপ। তবে টিকটক নেশা ছড়িয়ে গেছে পুরো দেশে। টিকটককে কেন্দ্র করেই বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকায় গত ৮ই মে সোমা আক্তারকে হত্যা করেছেন তার স্বামী আবদুল্লাহ আল নাইম। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। বিয়ের পর আর্থিক সংকটে ছিলেন এই দম্পতি। নানা হতাশায় ভুগছিলেন তারা। এরমধ্যেই টিকটক ও লাইকি অ্যাপস দিয়ে নানা ধরনের ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট দিতেন স্বামী-স্ত্রী। এতে প্রবল আসক্তি তৈরি হয় সোমা আক্তারের। বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম আজিজুল জানান, স্বামীর নিষেধ না শুনে ভিডিও বানিয়ে টিকটকে আপলোড করে যাচ্ছিলেন সোমা। এ নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। টিকটক অ্যাপসে ভিডিও তৈরি করা নিয়ে দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়। এর একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে নাইম তার স্ত্রী সোমাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন এবং কাপড় দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন নাইম। সোমা আক্তার (২০) বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সিংড়াই গ্রামের আবদুল করিম বকসের মেয়ে ও বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।
এই ডিজিটাল আসক্তির কারণে আগামী দিনে দেশ নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগতে পারে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, করোনার এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে টিকটক ভিডিও দেখতে আসক্ত হচ্ছে। একইভাবে ভিডিও তৈরিকারীদেরও আসক্তি বাড়ছে। কোনো নিয়ম নীতি, কর্মশালা বা শেখা ছাড়াই এখানে নিজেকে তারকা ভাবেন অনেকে। বেশি ভিউ পেতে নির্মাতারা যে কন্টেন্ট তৈরি করছেন তা কোনোভাবেই আমাদের সংস্কৃতি, সমাজের সঙ্গে যায় না। তা সমাজ, শিষ্টাচার বহির্ভূত। ভিডিওতে যারা অভিনয় করেন তাদের চুলের রং, পোশাক, এমনকি অঙ্গভঙ্গি নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। অনেক দেশেই নেতিবাচক দিক চিন্তা করে এসব অ্যাপস ব্যবহার করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
টিকটক নির্মাতারা জানান, অনেকেই টিকটক করছেন। এটা মেধা বিকাশের একটি মাধ্যম। এতে যখন লাইভ স্ট্রিম করা হয় তখন ফলোয়াররা ভিডিওগুলো পছন্দ করলে ভার্চ্যুয়ালভাবে মুদ্রা উপহার দেয়। বাড়ে জনপ্রিয়তা। তবে এটিকে যে যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে। অনভিপ্রেত, অশালীন কথা, গান, অঙ্গভঙ্গি দিয়ে যেমন এটি করা যায়, তেমনি ভালোভাবেও করা যায়। তবে রাতারাতি আলোচনায় আসতে অনভিপ্রেত পথেই হাঁটেন বেশির ভাগ টিকটক নির্মাতারা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, টিকটকে যা হচ্ছে তা মূলত বাস্তবতা বিবর্জিত। এমন কর্মকাণ্ডে আসক্তরা পরিবার সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে দিন দিন বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে মিথ্যা করেও হলেও অনেকে নিজেদের অভিনয় শিল্পী ভাবতে পারেন। সস্তা জনপ্রিয়তার নামে এমন আসক্তি ভয়াবহ। এজন্য অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
টিকটক ভিডিও তৈরিকারীদের আকাঙ্ক্ষা থাকে সেলিব্রেটি হওয়ার। এই আকাঙ্ক্ষার সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাদের বিপথগামী করে থাকে। কৌশলে বাধ্য করে পতিতাবৃত্তিতেও। এই চক্রের অন্যতম হোতা রিফাতুল ইসলাম হৃদয়। ভারতের কেরালায় গণধর্ষণের শিকার বাংলাদেশি তরুণীকে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করেছিলো এই হৃদয়। ঢাকায় এই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ। মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারাও।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ জানান, ইতিমধ্যে নির্যাতিতাকে ভারতের পুলিশ উদ্ধার করেছে বলে জানতে পেরেছি। কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড়িতে গত শুক্রবার শনাক্ত করার পর তাকে বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

0Shares