মুহূর্তেই কেঁপে উঠে মগবাজার নিহত ৭, আহত অর্ধশতাধিক

ভয়াবহ বিস্ফোরণ

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২১

ডায়ালসিলেট ডেস্ক;:রাজধানীর মগবাজার ওয়ারলেস গেট এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন অন্তত ১৫ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেখ হাসিনা জাতীয় প্লাস্টিক সার্জারী ও বার্ণ ইউনিটসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ৪০মিনিটে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

বিস্ফোরণে ওই এলাকার আটটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণে মগবাজারের আউটার সার্কুলার রোডের ৭৯ নম্বর তিন তলা ভবনটি নিচ তলা ও দ্বিতীয় তলার একাংশ উড়ে গেছে।

সামনের রাস্তার তিনটি বাস বিস্ফোরণে আগুন লেগে যায়। এতে ভবনের বিভিন্ন দোকানে অবস্থানকারী লোকজন, বাসযাত্রী ও পথচারীরা গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে রাস্তার দুই পাশের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ দিকে ৭৯ নম্বর ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে, একইভাবে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে রাস্তার ওপাশে উত্তরদিকে ১০০ ফিট দূরত্বে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আড়ং, বিশাল সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি ভবন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশে আগুন ছড়িয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই ৭৯ নম্বর ভবনের পেছনের একাংশ উড়ে যায়। ছাদ ধসে পড়ে। ভবনের সামনের অংশ গিয়ে রাস্তায় পরে। গ্লাস ভেঙে ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। এসিতে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার যানবাহনে। রক্তে ভেসে যায় ভবন থেকে শুরু করে ফুটপাত, রাস্তা। ততক্ষণে চারদিকে অন্ধকার। কান্নার শব্দ। কিছুক্ষণ পরেই আগুন নেভাতে চেষ্টা করেন আশপাশের লোকজন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছিলো।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ৭৯ আউটার সার্কুলার রোড এর তিন তলা ভবনটির নিচ তলা বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এই ভবনে বেঙ্গল মিট, সিঙ্গারের শো-রুম, গ্র্যান্ড কনফেকশনারি ও শর্মা হাউজ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। ভবনের নিচ তলায় একটি জেনারেটর ভেঙেচুরে পড়ে ছিল। বিস্ফোরণে ভবনের ধ্বংসাবশেষ ছিটকে সড়কে থাকা তিনটি বাস ও অন্যান্য যানবাহনের ওপর পড়ে। বাসে আগুন ধরে যায়। এতে বাসের যাত্রীরা অগ্নিদগ্ধসহ আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শী পরিষ্কার পরিচ্ছন্নকর্মী রমজান মিয়া জানান, ওই সময়ে তিনি ঘটনাস্থলে ফ্লাইওভারের নিচে শুয়ে ছিলেন। রমজান বলেন, আমরা ফ্লাইওভারের নিচে বসে ছিলাম। এসময় হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে। আগুন লেগেছে। দ্রুত বের হয়ে দেখি যে, বৃষ্টির মতো আশপাশের ভবনের কাঁচ ভেঙে পড়েছে।  তিনি আরও জানান, আরও সামনে গিয়ে দেখি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনের বাসের যাত্রীরা আহাজারি করছেন। কারও কারও শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছিলো। আমি একজনকে উদ্ধার করে রিকশায় করে আদদ্বীন হাসপাতালে রেখে এসেছি। রমজানের সঙ্গে থাকা পাখি বেগম নামে এক মহিলা জানান, বাসের মধ্যে দেখি যে, এক মহিলা কাতরাচ্ছেন। তাকে আমি উদ্ধার করি। বিস্ফোরণে আশপাশের মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে।

ডমিনো ভবনের ব্র্যাক বাংকের নিরাপত্তাকর্মী আফজাল হোসেন জানান, ভবনের নিচে আমরা নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছিলাম। এসময় ভবনের ওপর থেকে কাঁচ নিচে ভেঙে পড়ছিলো দেখে দৌড় দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাই। এসময় লোকজন প্রাণভয়ে ভবনের নিচে আশ্রয় নেয়।

রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম। এসময় তিনি বলেছেন, রাজধানীর মগবাজারে ভবনে বিস্ফোরণে সাতজন মারা গেছেন। বিস্ফোরণ আশপাশের সাতটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া তিনটি বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মগবাজার ওয়্যারলেস এলাকায় তিনতলা ভবনের নিচতলায় ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিকট শব্দের পর ওই এলাকা কেঁপে ওঠে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এটা নাশকতা কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, নাশকতা হলে সেখানে স্পিন্টার পাওয়া যেত, বোমার বিস্ফোরণ হতো। স্পিন্টারের আঘাতে মানুষ ক্ষতবিক্ষত হতো। কিন্তু বাসে কোনো স্পিন্টারের কনা পাওয়া যায়নি। অতএব, নিশ্চিতভাবে বলা যায় গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণ ঘটেছে, বোমার কোনো ঘটনা এখানে নেই।

এ ঘটনায় ৩৯ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও দগ্ধ ১৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। দগ্ধ ও আহতদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দু’জনকে মৃত অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, মর্মান্তিক এ  দুর্ঘটনায় মোট ১৭ জনকে এখানে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে দু’জনকে আমরা মৃত অবস্থায় পাই। এরমধ্যে দগ্ধ তিনজনের অবস্থা খুবই খারাপ। ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। বাকি আহতরা যারা আছেন, তাদের কারও পা কাটা গেছে, কারও পা ভেঙে গেছে বলে জানান তিনি।

ওই ঘটনার পরপর মগবাজারের দুদিকের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এসময় মগবাজার এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। গাড়িগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। ভোগান্তিতে পড়ে ওই সড়কে যাতায়াতকারী পথচারীরা। ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষ ভিড় করলে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও রেডক্রস কর্মীরাও ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেছেন, ৭৯ নম্বর ভবনটি যে কোন সময় ভেঙে যেতে পারে। এজন্য তারা আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। আজ সকালে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল এসে দেখবেন যে ভবনটি বসবাস যোগ্য কী-না। আগামী সাতদিনের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল  মো. সাজ্জাদ হোসাইন সাংবাদিকদের জানান, গ্যাস এবং ট্রান্সমিটার বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছি। তবে ঘটনার জন্য ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩ মারা গেছেন বলে  জেনেছি। আহত হয়েছে প্রায় ৬০ জন। তদন্ত কমিটি দেখবে আসলে কী কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এটি নাশকতা নয় বলে তিনি জানান।  ঢাকা মেডিকেলে যারা চিকিৎসাধীনদের মধ্যে রয়েছেন, মো. মামুন (৩০), শাহ নেওয়াজ পাটয়ারী (৩৫), হৃদয় (২৩), আরিফুল ইসলাম (৩৯), মেহেদী হাসান নয়ন (২২), মাহাবুব আলম (৩৯), মো. মুসা শাহজাহান (৪৫), স্বপন (৩৫), মো. শহিদ (৬৫), সৈকত (৮), আবুল ফজল (২৮), সালেহা বেগম (৬০), লাকী আক্তার (৩২),সাজ্জাদ (১৮), আইয়ুব খাঁন (২৫), সুভাষ চন্দ্র সাহা (৬৫), আরমান (২৫), রতন (৩০), মোকতার হোসেন (৩৫), মো. আসাদ (৫৮), আবুল কালাম আজাদ (৫৬), মোতালেব হোসেন (৪০), জামাল (৪০), নয়ন (৪০), আবুল কালাম (২৭) ও কালু (২৭)।

এদিকে এ ঘটনায় দুজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বিস্ফোরণস্থলের ঠিক উপরে তিনতলায় তারা অফিস করছিলেন। আহত দুই সাংবাদিক হলেন একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক মাহমুদ মেনন খান ও নির্বাহী সম্পাদক পলাশ মাহবুব। আহত হওয়ার খবর তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন।

এম/

0Shares