ছোটমনি নিবাসের সেই শিশুটিকে মেরেই ফেললো সুলতানা

প্রকাশিত: ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২১

ছোটমনি নিবাসের সেই শিশুটিকে মেরেই ফেললো সুলতানা

ডায়ালসিলেট ::পরিচয়হীন শিশুটিকে মেরেই ফেললো আয়া সুলতানা। কান্না করছিল শিশুটি। বিরক্ত হয়ে শিশুটিকে আছড়ে ফেলে দেয় বিছানায়। কিন্তু গিয়ে পড়ে খাটের স্টিলের রেলিংয়ে। ফেটে রক্ত ঝরছিল শিশুটির মাথা থেকে। পরে অঘটন ধামাচাপা দিতে বালিশ চাপা দিয়ে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ২২ দিন আগে ঘটেছিল সিলেটের বাগবাড়িস্থ ছোটমনি নিবাসে। হত্যার বিষয়টি আড়াল করে থানায় অপমৃত্যু মামলা করে লাশ দাফন করা হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না ছোটমনি নিবাসের আয়া সুলতানা ফেরদৌসী সিদ্দীকার। অপমৃত্যুর মামলার পর বিষয়টির তদন্ত শুরু করেন কোতোয়ালি থানার সাব ইন্সপেক্টর মাহবুব আলম মণ্ডল। তদন্ত গিয়ে তিনি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেন। আর ওই ফুটেজেই ধরা পড়ে মাত্র দু’মাস আগে জন্ম নেয়া শিশুটিকে হত্যার নির্মম দৃশ্য। যারাই ফুটেজ দেখেছেন তাদের চোখে জল এসে গেছে। এদিকে পুলিশি তদন্তে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে সুলতানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সিলেটে বাগবাড়িস্থ সমাজসেবা পরিচালিত ছোটমনি নিবাস। নিবাসে অসহায় পিতামাতাহীন সন্তানরা বসবাস করে। বর্তমানে সেখানে শূন্য থেকে ৭ বছর বয়সী ৪২ জন শিশু রয়েছে। তাদের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন ৫ জন আয়া। দুই মাস আগে গোয়াইনঘাটের মানসিক প্রতিবন্ধী এক নারী রাস্তায় একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেন। খবর পেয়ে গোয়াইনঘাটের সমাজসেবা কর্মকর্তা গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। শিশুটির নাম রাখা হয় নাবিল আহমদ। শিশুটিকে গোয়াইনঘাট থেকে গত ১২ই জুন সিলেটের ছোটমনি নিবাসে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে ওই নিবাসে তাকে লালন-পালন করা হচ্ছিল। সিলেটের সমাজসেবা কর্মকর্তা নিবাস রঞ্জন দাস মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ২৩শে জুলাই সকালে ছোটমনি নিবাসে থাকা নাবিল আহমদ নামের ওই শিশুটি অসুস্থ বলে দায়িত্বরতরা তাকে অবগত করেন। তার নির্দেশে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শিশুটির ময়নাতদন্তের পর লাশ দাফন করা হয়েছে। সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। তবে শিশুটির মৃত্যুর প্রেক্ষিতে সমাজসেবার এক কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ঘটনাকালীন সময়ের সিসিটিভির ফুটেজও তদন্ত টিমের সদস্যরা সংগ্রহ করেছেন। ঘটনার সময়ের ফুটেজ ও আয়াদের বক্তব্যে গরমিল পেয়েছেন। এদিকে কোতোয়ালি থানায় অপমৃত্যু মামলা গ্রহণের পর ওসি এসএম আবু ফরহাদ বিষয়টি তদন্তের জন্য সাব ইন্সপেক্টর মাহবুব হোসেন মণ্ডলের কাছে দায়িত্ব দেন। এসআই মাহবুব হোসেন ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে; কান্নারত ওই শিশুটিকে বিছানা থেকে তুলে আবার বিছানায় সজোরে আছড়ে মারেন দায়িত্বে থাকা আয়া সুলতানা। কিন্তু শিশুটি বিছানায় না পড়ে খাটের স্টিলের অংশে গিয়ে পড়ে। এতে মাথায় আঘাত লাগে। রক্তও ঝরছিল। এক পর্যায়ে শিশুটির মুখে বালিশ চেপে ধরেন আয়া সুলতানা। কোতোয়ালি থানার এসআই মাহবুব হোসেন জানিয়েছেন, বারবার সিসিটিভির ফুটেজ দেখার পর হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর তিনি ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেন এবং সিসিটিভির ফুটেজও ঊর্ধ্বতনরা পর্যালোচনা করেন। কোতোয়ালি থানা ওসি (তদন্ত) ইয়াসিন আহমদ জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর আমরা উপ-পুলিশ কমিশনার আজবাহার আলী শেখের পরামর্শ নেই। পরে তার নির্দেশে শিশুটিকে হত্যার দায়ে আয়া সুলতানাকে আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করতে সমাজসেবাকে পত্র দেয়া হয়েছে। সমাজসেবা মামলা না করলে পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মামলা করবে। এদিকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকা আয়া হত্যার বিষয়ে মুখ খোলেনি। সে শিশুটিকে বিছানার ওপর রাখার কথা স্বীকার করেছে। আছড়ে মারা এবং বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার বিষয়টি এড়িয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, মামলা দায়েরের পর আদালতে তুলে তার রিমান্ড চাইবে পুলিশ। অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো ঘটনা বেরিয়ে আসবে। সিলেটের সমাজসেবা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয়া সুলতানাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার আইনানুগ প্রক্রিয়া হবে। দোষী হলে অবশ্যই তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এখানে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। তবে খুনের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

ডায়ালসিলেট এম/

0Shares

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ