গণটিকা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন

প্রকাশিত: ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২১

গণটিকা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন

ডায়ালসিলেট ডেস্ক;:সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়াই চলতি মাসে গণটিকার আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। পাশাপাশি এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমন্বয় করে কাজ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গণটিকার বিষয়টি নিয়ে কমিটির ১০ম বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ১৭ই আগস্ট বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, পর্যাপ্ত টিকা মজুত না রেখে একদিকে গণটিকা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে অন্যদিকে রেজিস্ট্রেশন করে ভ্যাকসিন নিতে না পারায় মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও বিব্রতকর বলে তিনি মনে করেন। বৈঠকে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কত পার্সেন্ট নাগরিককে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে, আরও কি পরিমাণ ভ্যাকসিন প্রয়োজন এবং তা কি প্রক্রিয়ায় কোন কোন দেশ থেকে কতদিনের মধ্যে আমদানি করা যাবে বৈঠকে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে না। বহুদিন ধরে জি টু জি পদ্ধতিতে ভ্যাকসিন আমদানির কথা বলা হয়েছিল এবং রাশিয়াও স্ফুটনিক-ভি নামক ভ্যাকসিন দিতে রাজি হওয়ার পরও কি কারণে ১০ কোটি ভ্যাকসিন আনা হলো না তা তিনি জানতে চান। বৈঠকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সদস্য আ ফ ম রুহুল হক বলেন, কি পরিমাণ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে সে তথ্যটি গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে যথাসময় পৌঁছে না। কোন এলাকায় কত সংখ্যক লোককে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে সে বিষয়টি নিশ্চিত করে মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করার অনুরোধ জানান। এছাড়া গণভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম কি নামে অভিহিত হবে তা সঠিকভাবে জনগণকে অবহিত করার অনুরোধ জানান। তিনি সকল প্রকার বিভ্রান্তি দূর করার স্বার্থে, দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রী বা একজন কর্মকর্তা দ্বারা করোনা পরিস্থিতি ও ভ্যাকসিন প্রয়োগ সম্পর্কে নিয়মিত ব্রিফিং করার বিষয়টি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। এছাড়া তিনি ভ্যাকসিনের বর্তমান মজুত ও আগামীদিনে কি পরিমাণ আমদানি হবে তা কমিটিকে অবহিত করতে বলেন। কমিটির সদস্য সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মো. আব্দুল আজিজ বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় মডার্না ও গ্রামাঞ্চলে সিনোভ্যাক্স কেন দেয়া হলো সে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে মানুষ অবগত না থাকার কারণে যারা সরকারের বিরোধিতা করছে তারা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, শহরের মানুষকে ভালো ভ্যাকসিন ও গ্রামের মানুষকে খারাপ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকার দরকার ছিল। পূর্ব থেকে সংখ্যা নির্ণয় না করেই গণটিকার ঘোষণা প্রদান সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিভিন্ন কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে ভ্যাকসিন রাখা হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমিয়েছে এবং মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে। তিনি ভ্যাকসিন সম্পর্কিত এ ধরনের ভুল তথ্য প্রদান করে জনগণকে হয়রানি না করার অনুরোধ জানান। সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক বলেন, বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভ্যাকসিন নেয়ার আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে মানুষ ভ্যাকসিন পাচ্ছে না বিধায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকে বাগেরহাট-৪ আসনের এমপি আমিরুল আলম মিলন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনার বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। করোনাভাইরাসের প্রকোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামের মানুষের মাঝে আতঙ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব সরকারের অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এদিকে গতকালের বৈঠকে আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনাভাইরাসের টিকা সরবরাহের তাগিদ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে দেশে সরকারিভাবে করোনা টিকা উৎপাদনে পূর্ণ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বৈঠকে কমিটির সদস্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, ডা. আ ফ ম রুহুল হক, মুহিবুর রহমান মানিক, ডা. মো. মনসুর রহমান, ডা. মো. আব্দুল আজিজ, সৈয়দা জাকিয়া নুর, রাহগীর আল মাহী এরশাদ এবং মো. আমিরুল আলম মিলন অংশগ্রহণ করেন। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, টিকা উৎপাদনে আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে। এরপর সংসদীয় কমিটি এটা নিয়ে আলোচনা করবে। আমরা চাই, ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন বোতলজাত করে সরবরাহ করা হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আপাতত ভ্যাকসিন বোতলজাত করতে চাচ্ছি। তবে সম্ভব হলে এবং প্যাটেন্ট পেলে এখানেই আমরা ভ্যাকসিন প্রস্তুত করবো। সভাপতি জানান, এসেনশিয়াল ড্রাগের গোপালগঞ্জ ইউনিটই ভ্যাকসিন তৈরির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই অবকাঠামো তৈরি করে আমরা ভ্যাকসিন বোতলজাত করবো। ওই প্রতিষ্ঠানের ৮ একর জমি রয়েছে। সেখানেই ভ্যাকসিনের জন্য ইউনিট হবে। আমরা দেশের জন্য প্রয়োজনীয় নিউমোনিয়া, যক্ষ্মাসহ অন্যান্য যেসব ভ্যাকসিন রয়েছে, সেগুলোও সেখানে উৎপাদন করবো। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে করোনার ভ্যাকসিন উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবায়নে তারা দুটি কমিটি গঠন করেছে। একটি হচ্ছে উপদেষ্টা কমিটি এবং অপরটি কারিগরি কমিটি। উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন- স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং এসেনশিয়াল ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই কমিটি কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ভ্যাকসিন উৎপাদন কারিগরি কমিটিকে পরামর্শ দেবে এবং কারিগরি কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে ভ্যাকসিন উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন গ্রহণ করবে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে গঠিত কারিগরি কমিটির সদস্য সচিব হলেন এসেনশিয়াল ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সদস্যরা হলেন- ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য), আইইডিসিআরের পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এমএনসিঅ্যান্ডএইচ) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ডিন ড. আব্দুর রহমান। এই কমিটি দেশে কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন উৎপাদনে পদক্ষেপ গ্রহণ, এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান, ভ্যাকসিন উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা গ্রহণ এবং উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহার পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করবে। কমিটি সূত্র জানায়, সরকারের এই দুই কমিটির পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও একটি পৃথক কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটিকেও ভ্যাকসিন বোতলজাতকরণ/উৎপাদনের বিষয়ে এক মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সব ঘোষণা এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রদানের সুপারিশ করা হয়। কমিটির সুপারিশগুলোর কপি সকল মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর সুপারিশ করা হয়।

ডায়ালসিলেট এম/

0Shares