টিকা পেতে প্রবাসীদের ভোগান্তি বিক্ষোভ

প্রকাশিত: ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১

টিকা পেতে প্রবাসীদের ভোগান্তি বিক্ষোভ

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::সৌদি প্রবাসী মিলন হাওলাদার। ৮ই সেপ্টেম্বর ভোলা জেলার তজুমুদ্দিন থেকে ঢাকায় আসেন। পরদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনার টিকা নেয়ার তারিখ। ভোর থেকে টিকা নেয়ার জন্য অন্যান্যের সঙ্গে লাইনে দাঁড়ান। ৫ ঘণ্টা লাইনে অবস্থান করেও টিকা পাননি। ৯ই সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন তার মতো কয়েক শতাধিক প্রবাসী। যারা টিকার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। মিলন হাওলাদার মানবজমিনকে বলেন, নির্দিষ্ট দিনে টিকার জন্য এসেও টিকা পেলাম না।এদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক একটা দিন যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে, সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার আশা ভঙ্গ হচ্ছে। এ নিয়ে আমার পরিবারের সদস্যরাও চিন্তিত। ৯ই সেপ্টেম্বর করোনার টিকা দেয়ার তারিখ ছিল। সেদিন সকাল থেকে আনসার সদস্যরা আমাদেরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে। বেলা ১১টার দিকে কয়েকজন আনসার সদস্য এসে জানায় প্রবাসীদের জন্য টিকা ঢামেকে পৌঁছায়নি। আমাদেরকে ১১ই সেপ্টেম্বর আবার সেখানে যেতে বলে। কিন্তু এদিনও আমাদেরকে টিকা দিতে পারেনি। কবে টিকা পাবো, সেটাও জানাতে পারেনি। আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টিকা নেয়ার জন্য ঢাকায় আসছি। এখানে আমাদের অনেক কষ্টে থাকতে হচ্ছে। আমরা হয়রানির শিকার হয়েছি।এদিকে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে ও কর্মক্ষেত্রে ফিরাতে প্রবাসীদেরকে করোনার টিকার আওতায় এনেছে সরকার। সে অনুযায়ী গত কয়েক মাস ধরে টিকা দেয়া হচ্ছে। প্রবাসীরা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি’র অধীনে টিকার জন্য নিবন্ধন করে। সে অনুযায়ী টিকা দেয়ার জন্য সরকার ঢাকার সাতটি হাসপাতালে শ্রমিকদের টিকা কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এগুলো হচ্ছেÑঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। তবে শুরু থেকেই প্রবাসীরা টিকা পাওয়া নিয়ে নানা অভিযোগ করে আসছেন। অনেকে নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে গিয়েও টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন। আবার কখনো কখনো টিকাকেন্দ্রে বিক্ষোভ করছেন প্রবাসীরা। নির্দিষ্ট সময়ে টিকা না পেয়ে অনেকেই প্রবাসে ফিরতে পারেননি। এরই মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তারা। প্রবাসীরা যে পরিমাণ নিবন্ধন করেছে তার তুলনায় স্বল্প সংখ্যক প্রবাসীদেরকে টিকা দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকে বলছেন, প্রবাসীদেরকে সিনোফার্মের টিকা দেয়া হয়েছে। যা সৌদিসহ অনেক দেশে এ টিকার মূল্যায়ন হচ্ছে না। এতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী দেশে আটকে আছেন।

নির্দিষ্ট দিনে টিকা না পাওয়া প্রবাসীরা জানান, গত ৯ই সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলে কয়েক শতাধিক প্রবাসীকে টিকা দেয়ার কথা থাকলেও, এদিন প্রবাসীরা টিকা পাননি। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করলেও টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন। ওই দিন প্রবাসীদের জন্য টিকাগুলো কেন্দ্রে এসে পৌঁছায়নি জানিয়ে কর্তৃপক্ষ গতকাল ১১ই সেপ্টেম্বর আবার একই কেন্দ্রে যেতে বলেন। শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত টিকার জন্য অপেক্ষা করেও টিকা পাননি। এতে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।এরই মধ্যে টিকা না পাওয়া প্রবাসীদের একটি অংশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা জানান, শনিবার সকালে টিকার জন্য লাইনে দাঁড়ালেও কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়, আমাদের জন্য টিকা নেই। আমাদেরকে ৯ই সেপ্টেম্বর টিকা নেয়ার জন্য এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ে এসেও টিকা পাচ্ছি না। আমাদেরকে ঘুরানো হচ্ছে। হয়রানি করা হচ্ছে।শেরপুর থেকে আসা সৌদি প্রবাসী রিপন অভিযোগ করে বলেন, করোনার টিকা নিয়ে আমরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। আমাদেরকে টিকা দেয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে এনেও টিকা দেয়া হচ্ছে না। আমাদের জন্য টিকা নেই বলে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। টিকা আছে, অন্যরা পাচ্ছে আর আমরা প্রবাসীরা পাচ্ছি না। ভিসার মেয়াদ আর ২ মাস বাকি। ২ মাসের মধ্যে টিকা দিয়ে বিদেশে যেতে পারবো কিনাÑ এ নিয়ে দুচিন্তার মধ্যে আছি।

এদিকে মানববন্ধনে অংশ নেয়া সুনামগঞ্জ থেকে আসা সৌদি প্রবাসী কামরুজ্জামান বলেন, আমাদেরকে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়েছে বৃহস্পতিবার (৯ই সেপ্টেম্বর) টিকা দেয়া হবে। নির্দিষ্ট তারিখে ঢামেক হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে আসি। সেখানে আমাদের সবাইকে সিরিয়ালে দাঁড়াতে বলে। সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে থাকা আনসার সদস্যরা জানায়, আমাদেরকে যেসব টিকা দেয়া হবে সেগুলো কেন্দ্রে এসে পৌঁছায়নি। এ টিকাগুলো শনিবার (১১ই সেপ্টেম্বর) দেয়া হবে। ২ দিন পর শনিবার সকালে টিকার জন্য লাইনে দাঁড়ালে সেখান থেকে জানানো হয় আমাদের জন্য টিকা নেই। তিনি বলেন, আমাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এখনো অনেকে প্রথম ডোজ টিকাও নিতে পারেনি। অনেকে রেজিস্ট্রেশন করে ২ মাস ধরে বসে আছেন। এসএমএস না আসায় টিকা নেয়ার জন্য আসছেন না। আর যাদেরকে এসএমএস দিয়েছে তারা এসেও টিকা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ টিকাকেন্দ্রের সামনে প্রবাসীরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাদেরকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। পরে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন।

চাঁদপুর থেকে টিকা নিতে আসা নাঈম ইসলাম নামের একজন প্রবাসী বলেন, ২ মাস আগে আমি টিকার জন্য নিবন্ধন করেছি। ৬ই সেপ্টেম্বর আমার মেসেজ এসেছে, এর পরদিন আমি এখানে আসি। ওইদিন আমাকে টিকা দেয়া হয়নি। তখন আমাকে শনিবার আসার কথা বলে দেয়। সে অনুযায়ী আজ (গতকাল শনিবার) ফজরের পর আমি এই টিকাকেন্দ্রে এসেছি। এসে লাইনে দাঁড়াই। এরপর বলছে, আমাদেরকে আজকেও টিকা দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আমাদের অধিকাংশ প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ চলে যাচ্ছে। সবাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। তারা সবাই এজেন্সিতে টাকা দিয়ে রাখছে। আমাদের সেভাবে কোনো আশ্বস্তও করছে না যে, কবে টিকা পেতে পারি। আমরা দাবি জানাচ্ছি, প্রবাসীদের যেন দ্রুত টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।এ বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, আমরা কোনো প্রবাসীকেই আজকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়ার জন্য এসএমএস দেইনি। আজ যারা এসেছেন, তাদের পূর্বের তারিখে টিকা নেয়ার দিন ছিল। তখন তারা বিভিন্ন কারণে আসতে পারেনি, এখন তারা এসে টিকা নিতে চাচ্ছে। আমাদের এখানে প্রথম ডোজ সিনোফার্মা চালু আছে। আমরা তাদেরকে সিনোফার্মার টিকা নিতে অফার করেছি যে, সিনোফার্মা আমাদের এখানে চলমান, আপনারা এটা নিতে পারেন। তিনি আরও বলেন, আর যাদের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার ও মডার্না না নিলে চলবে না তাদেরকে আমরা বলছি, আপনারা খবর রাখেন যখন সরকার এগুলো চালু করবে, তখন আপনারা আসবেন।

0Shares