প্রাণের উচ্ছ্বাস

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

প্রাণের উচ্ছ্বাস

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। দেড় বছর পর শিক্ষালয়ে ফেরার দিনটি অনেকটা ঈদের আনন্দের মতো উদ্যাপন করেছে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিন রাজধানীসহ সারা দেশে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। নানা আয়োজনে বরণ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। সরকারি নির্দেশনা মেনে খুলেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রথমদিন তুলনামূলক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল কম। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি কম ছিল বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

তাছাড়া, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সরকারি নির্দেশনার কিছু ব্যত্যয়ও চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়। এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সময় তখন সকাল সাড়ে সাতটা প্রায়। ফার্মগেটে মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছে ছোট্ট রাগিব আল হাসান। স্কুলে যাবার আগে চাই তার নতুন ঘড়ি। চতুর্থ শ্রেণির রাগিবের হাত ধরে মায়ের অপেক্ষা কখন খুলবে ঘড়ির দোকান। নতুন ঝকঝকে স্কুল ইউনিফর্মের সঙ্গে নতুন ঘড়ি না হলে চলবেই না রাগিবের।

উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় নেয়া হয় নানা আয়োজন। প্রতিষ্ঠানের বাইরে গতি রোধ করা করা হয় যানবাহনের। ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলছে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানের ফটকে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মাপা হচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা। হাত জীবাণু মুক্ত করতে দেয়া হয় স্যানিটাইজার। শিক্ষকরা হাসিমুখে বরণ করে নেন শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্কুলে ফিরেই শিক্ষকদের হাত থেকে পায় লাল গোলাপ ও চকলেট।

৫৪৩ দিন পর শুরু ক্লাসে ফেরা শিক্ষার্থীদের দিনটা শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। বিধিনিষেধের কারণে হয়নি এসেম্বলি। এরপর সকলের মঙ্গল কামনায় করা হয় মোনাজাত।

শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বসানো হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এক বেঞ্চে একজন করে। নিশ্চিত করা হয়েছে মাস্ক।

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিন জাহির বলেন, আমাদের যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস দেয়া হয়েছে এই সিলেবাসে আমি বা আমরা এক্ষুণি পরীক্ষা দিতে পারবো। তাই আমাদের আর অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত পরীক্ষা নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদ্রিতা রায়। স্কুলে আসার পর থেকেই ছুটে বেরিয়েছে এপাশ থেকে ওপাশ। শিক্ষকরাও তার ছোটাছুটি উপভোগ করেছেন। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার বৃত্তে লাফিয়ে বেরিয়েছে সে। আদ্রিতা সবার সঙ্গে প্রথম দেখায় করেছে ‘কনুই শেক’। আদ্রিতা বলে, ঘরে থাকতে থাকতে মাথা ধরে যেতো শুরুতে।

ফের বাজে ঘণ্টা। প্রাথমিকের ক্লাস শেষ। সারিবদ্ধভাবে বের হয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে তারা। এসময়টায় বাইরে অপেক্ষা করেছেন অভিভাবকরা। যদিও বিদ্যালয়ের ভেতরে সুরক্ষার নানা আয়োজন থাকলেও বাইরে অভিভাবকদের এই জটলায় স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা দেখা যায়নি।

উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম বলেন, আমরা মাউশি থেকে যে ১৯ নির্দেশনা পেয়েছি সেটি পালন করছি। আবারো যাতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে না যায় কিংবা কোনো শিক্ষার্থী বিপদের মুখে না পড়ে সেদিকে আমরা সর্বাত্মক খেয়াল রাখবো।

ফার্মগেটে গভর্নমেন্ট সায়েন্স হাইস্কুলে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের সবার মুখে মাস্ক থাকলেও স্কুলের গেটের বাইরে মানছে না সামাজিক দূরত্ব। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছে। এসময় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিব আহমেদ বলেন, এতদিন পরে স্কুলে ক্লাস করতে পেরে খুবই আনন্দিত। এতদিন বাসায় বসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। পড়াশোনায়ও ওইভাবে মন বসেনি কখনো। অনলাইন ক্লাস করে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলাম না। আবার আগের মতো পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারবো। অনেকদিন পর স্যার ও বন্ধুদের দেখে ভালোই লাগছে। স্কুলটিকে প্রথমে অচেনা লেগেছিল। এখন ক্লাস করে অনেক ভালো লাগছে। পূর্বের ক্লাসরুমের স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে।

সকাল ৬টা বাজতে বাজতেই স্কুল ব্যাগ কাঁধে সামনে ভিড় করছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। বন্ধুদের দেখে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। চোখে-মুখে ছিল তাদের বাঁধভাঙা আনন্দ। স্কুলের প্রবেশমুখে শিক্ষার্থীদের ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে মাপা হচ্ছে তাপমাত্রা। একটু ভেতরে যেতে না যেতে শিক্ষার্থীদের ফুল, বাদ্যযন্ত্র ও গানের মাধ্যমে স্বাগত জানায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। ক্লাসরুমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে পাঠদান। এক বেঞ্চে দুইজন করে শিক্ষার্থী বসিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

গভর্নমেন্ট সায়েন্স হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক সোহেল আহমেদ বলেন, দুই শিফটে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল আমাদের স্কুলে দশম ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে। একটি শিফটে ৪০ মিনিট করে ক্লাস হবে। সবমিলিয়ে আমাদের ১১শ’ শিক্ষার্থী।

আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শনে শিক্ষামন্ত্রী: সকাল সাড় ১০টায় আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পরিদর্শন শেষে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, করোনা সংক্রমণের হার কিছুটা কমে আসায় আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবো, যদি পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যায় আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। এক্ষেত্রে জোন ভিত্তিতে হয়তো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যেতে পারে। তবে আশা করছি, সেটির আর প্রয়োজন হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে বলেন, যাদের টিকা দেয়া হয়নি তাদের বিষয়েও আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলমান রয়েছে। তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল, সিন্ডিকেট আছে তারা সিদ্ধান্ত জানাবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবো।

ডা. দীপু মনি বলেন, কোনো অভিভাবক যেন স্কুলের ভেতরে এসে ভিড় না জমান। একান্তই যদি কাউকে ভেতরে অবস্থান করতে হয় তাহলে অবশ্যই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করবেন। করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ?্যবিধি মেনে চলতে হবে। আজ আমি ঘোষণা দিয়ে পরিদর্শনে এসেছি। এরপর থেকে ঘোষণা দিয়ে আসবো না। যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান ময়লা-আবর্জনা পাওয়া যায়, তাহলে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে হবে। অভিভাবকদের বলবো, শিক্ষার্থীদের ফুল হাতা পোশাক পরিধান করানোর জন্য। আর যেহেতু এই দেড় বছরে শিক্ষার্থীদের পোশাক অনেকের ছোট হয়েছে তাই আপাতত পোশাকের বিষয়ে চাপ দেয়ার প্রয়োজন নেই।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে আমাদের ভিন্ন পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আশা করছি বন্যা পরিস্থিতি অতটা খারাপের দিকে যাবে না। তাই আমাদেরও নতুন আর পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন হবে না।

অভিভাবকরা যদি টিউশন ফি একবারে দিতে না পারেন, তাহলে তাদেরকে মাসিক কিস্তির ভিত্তিতে টিউশন ফি পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন তিনি।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (স্কুল) বেলাল হোসাইন প্রমুখ।

ডায়ালসিলেট এম/

0Shares