বিএনপির পুনর্গঠনে হতাশ তৃণমূল

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৬, ২০২১

বিএনপির পুনর্গঠনে হতাশ তৃণমূল

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::পুনর্গঠন নিয়ে হতাশ বিএনপির তৃণমূলের নেতারা। বেশ কয়েকটি জেলায় ও এর অধীনে থাকা ইউনিটে তাদের মতামত না নিয়ে কমিটি গঠন করায় বাড়ছে দ্বন্দ্ব-কোন্দল। এসব কমিটিতে মৃত, প্রবাসী ও আওয়ামী লীগ কর্মীরাও স্থান পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিপরীতে অনেক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা বাদ পড়েছেন। তারা রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে দলের কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখছেন, কেউ কেউ পদত্যাগেরও চিন্তা করছেন। বিএনপির তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের এক দফা দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এর অংশ হিসাবে ৩০ ডিসেম্বরের আগে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক জেলা ও এর অধীনে থাকা পৌর, উপজেলা, থানাসহ সব পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ শুরুও করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। গত দুই মাসে বেশ কয়েকটি জেলা ও ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। অধিকাংশ কমিটি গঠনে নানা অভিযোগ কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা পড়েছে। এতে যোগ্যদের বাদ দেওয়া, মৃত, প্রবাসী ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের কমিটিতে রাখাসহ নানা অনিয়মের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। তারা বলেছেন, দলের নেতাকর্মীরা আগামী দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বলছেন, কিন্তু যাদের দিয়ে দল পুনর্গঠন করা হচ্ছে তাদের দিয়ে আন্দোলন সফল করা যাবে না। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। জেলা কমিটি গঠনে কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। অভিযোগ পেলে দল ব্যবস্থা নেবে। কিছু কমিটি নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর ইতোমধ্যে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। নাটোরের বাগাতিপাড়ায় নবগঠিত উপজেলা ও পৌর এবং গোপালপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে মৃত ব্যক্তিদের পদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব কমিটি গঠনে দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। বুধবার কমিটি বাতিলের দাবিতে স্থানীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছেন। উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা নয়ন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজন বাগাতিপাড়া পৌর মেয়র মোশাররফ হোসেনকে আহ্বায়ক ও হাফিজুর রহমানকে সদস্য সচিব করে যে উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে সেখানে মৃত ব্যক্তি আজিজুল হককে ২৫ নম্বর ক্রমিকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জামাল হোসেনকে আহ্বায়ক ও মাইনুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে গঠিত পৌর কমিটিতে ৩১ নম্বর ক্রমিকে থাকা আহাদ আলী মৃত। আজিজুল হকের ছোট ভাই হাফিজুর রহমান জানান, তার ভাই ১২ ফ্রেরুয়ারি মারা গেছেন। অন্যদিকে আহাদ আলীর ছেলে মেহেদী হাসান জানান, তার বাবা ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর মারা গেছেন। সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা আরও জানান, উপজেলা আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেনের ভাই জামাল হোসেনকে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে। অথচ তিনি দলে নিষ্ক্রিয়। সদস্য সচিব করা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে পঙ্গু মাইনুল ইসলামকে। ত্যাগীদের বাদ দিয়ে দুই কমিটিতে মা-ছেলেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। যার মধ্যে মা হোসনে আরা পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আর তার ছেলে হাবিবুর রহমান হয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীনুর আলম যুগান্তরকে বলেন, নবগঠিত গোপালপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতেও মৃত ব্যক্তিকে পদ দেওয়া হয়েছে। পৌর তাঁতী দলের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস সরকার ১৫ মাস আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাকে কমিটিতে ১৮ নম্বর সদস্য করেছে। এ ছাড়া পৌর কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে জিল্লুর রহমানকে, যিনি এর আগে দলের কোনো পদে ছিলেন না। তিনি বছরের বেশিরভাগ সময় ব্যবসার কাজে সৌদি আরব থাকেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিব উন নবী সোহেল বলেন, পক্ষ-বিপক্ষ থাকলে নানা অভিযোগ আসে। চারটি কমিটির মধ্যে একজনের বিষয়ে শুনেছি তিনি মৃত; তিনজন নয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হয়েছে। করোনার মধ্যে একজন মারা যেতে পারেন। রাজবাড়ী জেলার কমিটি নিয়েও অভিযোগে উঠেছে। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুলতান নুর ইসলামের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা গোয়ালন্দ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা, কর্মিসভা বা বর্ধিত সভা না করে জেলা আহ্বায়ক কমিটি ১৮ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছে। সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির ৭ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেলের জন্মদিন উদযাপন করেছেন। ৮ নম্বর সদস্য আবদুল খালেক ব্যাপারী আওয়ামী লীগে যোগদান করে শ্রমিক লীগের শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। ২৭ নম্বর সদস্য আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে জাতীয় নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল, নোয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলার অধীনে থাকা উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইতোমধ্যেই পালটাপালটি কমিটি গঠনসহ নবগঠিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বিএনপি সূত্র জানায়, ফরিদপুর জেলা কমিটি গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দুই কেন্দ্রীয় নেতার গ্রুপিং ও দ্বন্দ্বের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জেলা শাখায় দীর্ঘদিন কোনো কমিটি নেই। সম্প্রতি কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে। তিনি স্থানীয় নেতাদের নিয়ে বেশ কয়েকটি সভা করেছেন। মাদারীপুর জেলার কমিটিও দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। এ জেলায়ও নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফরিদপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, ফরিদপুর ও মাদারীপুর জেলা কমিটি শিগগিরই দেওয়া হবে। এ ছাড়া শরীয়তপুর জেলা কমিটি গঠনেও কাজ চলছে। রাজবাড়ী জেলার কয়েকটি ইউনিটের কমিটি গঠনে নানা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব সত্য নয়। রাজবাড়ী জেলার ইউনিটগুলোর কমিটি গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে। সম্প্রতি বরিশাল মহানগর, বরিশাল উত্তর ও দক্ষিণ জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বরিশাল মহানগরের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ারকে রাখা হয়নি কমিটিতে। এমনকি তার অনুসারীদেরও কাউকে পদ দেওয়া হয়নি। যে কারণে একটি বড় অংশ নাখোশ। আবার একই দিনে টাঙ্গাইল জেলা কমিটি দেওয়া হয়। সেখানে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতা এক পদ’ মানা হয়নি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খানকে জেলা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আবার স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসাবে পরিচিত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর (কারাগারে) পরিবারের কাউকে জেলা কমিটিতে পদ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়াও জেলা কমিটির সাবেক দুবারের কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলামকেও কমিটিতে রাখা হয়নি। মাইনুল স্থানীয় রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতা হিসাবে পরিচিত। আন্দোলন-সংগ্রামসহ নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে ছিলেন। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খন্দকার সাইদুল হক সাদু বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, আহ্বায়ক কমিটির ৮-১০ জন ছাড়া সবাই গত ছয় বছরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কমিটির বেশিরভাগ সদস্য সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। যেসব নেতাকর্মী ওয়ার্ড কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য নয়, তাদের আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়েছে।

ডায়ালসিলেট এম/

0Shares

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ