বিএসএফকে অবশ্যই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে

প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২১

বিএসএফকে অবশ্যই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে

ডায়ালসিলেট ডেস্ক::এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র গুলিতে আরও দু’জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ওই হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহত দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ‘গরু চোরাচালানে সম্পৃক্ততা’র অভিযোগ ছিল। বলাবলি আছে এরা ভারতীয় গরু চোরাকারবারিদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। চোরাচালান বা সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে ‘প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে চলেছে। সর্বশেষ গত ২রা নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে দুই বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ জোয়ানরা। সিলেটের ঘটনার ৯ দিনের মাথায় লালমনিরহাটে একই কায়দায় গুলি করে হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল ঘটনার খবর চাউর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম নিউজ-১৮কে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রী বলেন, অবশ্যই বিএসএফকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে। অনুপ্রবেশ রোধে ‘ধৈর্য্যে’র সঙ্গে তাদের কাজ করতে হবে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ আখ্যায়িত করে বলেন, বিএসএফকে সীমান্তে ‘মারণাস্ত্র’ ব্যবহারের বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশিদের ভারতে অনুপ্রবেশ এবং ভারতীয়দের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা একই আকাশের নিচে বসবাস করি এবং নিঃশ্বাস নেই। তারপরও কিছু প্রটোকল রয়েছে, যা আমাদের মানতে হয়। লালমনিরহাট সীমান্তে (কোচ বিহারে) যে গুলির ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত। আমি মনে করি তাদের (বিএসএফ) উচিত মারণাস্ত্রের ব্যবহারের পরিবর্তে ধৈর্য্যের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। গুলি করার পূর্বে তাদের অবশ্যই এ নিয়ে ভাবা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের অতুলনীয় সম্পর্ক রয়েছে। এটাকে তিনি ‘জাদুকরি’ সম্পর্ক বলে উল্লেখ করেন। তবে মন্ত্রী বলেন, আমি এখন শুধুমাত্র সীমান্ত হত্যা বন্ধের কথা তুলে ধরতে চাই। আমি আশা করবো ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। এখনই সময় সীমান্তে প্রাণহানি রোধে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করার। বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা চাইবেন কি-না? জানতে চাইলে মিস্টার খান বলেন, ‘আমি ঘটনার বিষয়ে এজেন্সিগুলোর কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছি। আগে আমাকে রিপোর্টটি পড়তে হবে। এরপরই কেবল আমি এ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবো।’ উল্লেখ্য, ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় ভাল্লা যখন বিএসএফ এবং সীমান্ত পরিকাঠামো নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে কলকাতা গেছেন তখনই ওই জোড়া হত্যার ঘটনা ঘটলো। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে সীমান্তে বিএসএফ এখন ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত নজরদারি এবং তল্লাশি করতে পারে। আগে সেটি ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল। অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে পাঞ্জাব এবং পশ্চিমবঙ্গে। বিএসএফ অবশ্য দাবি করেছে গত বৃহস্পতিবারের রাতের ঘটনায় তাদের এক জোয়ানও আহত হয়েছেন। বিএসএফ’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, মধ্যরাতে গরু পাচারের উদ্দেশ্যে ৫০ সদস্যের চোরাকারবারি একটি দল সীমান্তে জড়ো হয়। গরু পাচারের জন্য তারকাটা বেড়ার উপর দিয়ে তারা কপিকল লাগানোর কাজ করছিল। টহল টিমের উপস্থিতি টের পেলে বিএসএফ জোয়ানদের পাচারকারীরা পাথর ছুড়তে শুরু করে, দা, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে আক্রমণও করে। জোয়ানরা তখন আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। ওই এলাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার বিষয়ে আগেই বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করে বিএসএফ। লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর ঘটনার বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয়ভাবে গোলাগুলি ও মানুষের হতাহতের খবর জানতে পেরেছি। বিস্তারিত বিজিবি বলতে পারবে। স্থানীয় সূত্রগুলো নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তারা হলেন- কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়নের মালগড়া এলাকার আলতাব হোসেনের ছেলে আসাদুজ্জামান ভাসানী ও ইদ্রিস আলীর ছেলে মোসলেম উদ্দিন। গতকাল গোড়ল ইউনিয়নের বুড়িরহাট সীমান্তের ৯১৭নং মেইন পিলারের কাছে ভারতীয় অংশে তাদের মৃতদেহ পড়েছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ বিষয়ে গোড়ল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাহামুদুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়নের বুড়িরহাট সীমান্তের ওপারে গরু আনতে যান আসাদুজ্জামান ভাসানী ও মোসলেম উদ্দিনসহ তার সঙ্গীরা। ফেরার পথে ৯১৭নং মেইন পিলারের ৫নং সাব পিলার ব্যাটালিয়নের বিএসএফ’র ক্যাম্পের টহলে থাকা সদস্য তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই বাংলাদেশি নিহত হন। ঘটনার পর বিএসএফ সদস্যরা তাদের মরদেহ নিয়ে গেছে বলেও জানান ইউপি চেয়ারম্যান মিস্টার ইসলাম। এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরজু মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, স্থানীয়রা তাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনা সত্য, পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ফ্লাগ মিটিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘটিত হত্যার বিষয়ে তদন্ত করতে অব্যাহতভাবে দাবি জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা বলছে, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ’র নির্যাতনের নতুন অভিযোগের ঘটনার তদন্ত এবং জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। বিবিসি বাংলার রিপোর্টে জানানো হয়, বাংলাদেশে গরু পাচার চক্রের সঙ্গে বিএসএফ’র কর্তব্যরত ও প্রাক্তন কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতা, কাস্টমস ও পুলিশের একাংশের জড়িত থাকার কথা প্রমাণ পেয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো সিবিআই। ২০১৮ সালে কেরালায় বিএসএফ’র একজন কমান্ড্যান্ট নগদ প্রায় ৪৭ লাখ টাকাসহ ধরা পড়ার পরে ওই চক্রটির কথা সামনে আসে। তখনই তদন্তে নামে সিবিআই। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশের অন্যতম সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সীমান্তে গুলিতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুলিতে আহত হয়েছে ৪ জন এবং ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তিনজনকে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তে হত্যা এবং নির্যাতনের আরও অর্ধডজন ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে মোট ৪২ জন বাংলাদেশি নিহত এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করেছিল একাধিক মানবাধিকার সংস্থা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রেকর্ড মতে, ২০১৯ সালে বিএসএফ’র হাতে প্রাণ গেছে ৪৩ জন বাংলাদেশির, যাদের মধ্যে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে গুলিতে। ওই বছরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জাতীয় সংসদে ১০ বছরের সীমান্ত হত্যার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। যাতে বলা হয় ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফ’র হাতে মোট ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বছরভিত্তিক সরকারি হিসাবমতে, ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ’১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ জন।

ডায়ালসিলেট এম/

0Shares