মাতৃভাষার ফেরিওয়ালা বৃন্দা রানী

প্রকাশিত: ১২:২৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৩

মাতৃভাষার ফেরিওয়ালা বৃন্দা রানী

ডায়াল সিলেট ডেস্ক    মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় শব্দের পেছনের ছবি মানসপটে আঁকা হয় না। তাই শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে মাতৃভাষা। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দেশের ছাত্রছাত্রীরা ভিন দেশের ভাষায় লেখাপড়া করে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থবিত্তে উন্নত হয়েছে।
কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মণিপুরী শিশুরা। তারা কথা বলে যে ভাষায়, সে ভাষাটি বইতে খুঁজে পায় না। মণিপুরী শিশুদের বেশিরভাগেরই নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই। অথচ এই ভাষার রয়েছে নিজস্ব লিপি। আছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য।
মাতৃভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও শিক্ষালাভের অধিকার বঞ্চিত মণিপুরী সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। তবুও নিভু নিভু প্রদীপটা জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। তাই নিজ ভাষার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন মাতৃভাষার ফেরিওয়ালা বৃন্দা রানী।
যিনি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মণিপুরী পরিবারের সন্তান। পুরো নাম ওজা বৃন্দা রানী সিনহা। তিনি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের হকতিয়ারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
মণিপুরী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ‘ইমালোন’। এই ভাষাটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য ২০১৯ থেকে কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের হকতিয়ারখোলায় নিজবাড়িতে ‘মণিপুরী ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন বৃন্দা রানী। নিজ উদ্যোগে বিনা বেতনে এটি পরিচালনা করে আসছেন প্রায় চার বছর ধরে। বর্তমানে মোট ৩৫ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং নানা বয়সের ২১জন মহিলাকেও পাঠদান করে থাকেন। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মণিপুরী বর্ণমালা শেখার। দুয়ার খুলেছে গবেষণারও।
শিক্ষিকা বৃন্দা রানী বলেন, বাংলাদেশে মণিপুরী ভাষার প্রায়োগিক ক্ষেত্র যেমন নেই, তেমনি নেই এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ। ফলে কালের বিবর্তনে এই ভাষা ও সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মণিপুরী ভাষার বর্ণমালা রক্ষায় তার স্বামী সুখময় সিংহকে সঙ্গে নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের ভাষাটি যেন তুলে দেওয়া যায়, সেই চিন্তা থেকেই মণিপুরী ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলা হয়।
বিদ্যালয় স্থাপনের মতো কোনো ঘর না থাকায় নিজের বসতঘরের বারান্দায় এটি পরিচালনা করে আসছেন জানিয়ে বৃন্দা রানী সিনহা বলেন, এখানে শিশুরা তাদের নিজস্ব বর্ণমালায় পড়তে ও লিখতে পারছে। ফলে মণিপুরী শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল স্রোতোধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টায় মণিপুরী ভাষাচর্চায় নতুন প্রাণ ফিরেছে।
ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী অহনা সিনহা বলেন, স্কুলে বাংলায় যেগুলো শিখি তা এখানে আমাদের ভাষায় শিখতে পারছি। তবে আমাদের বর্ণমালার বই না থাকায় অনেক কষ্ট হয় পড়াগুলো মনে রাখতে।
মণিপুরী জাতি হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ব করেন মণিপুরী ভাষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী জেসমিন বিনতে জমসেদ। তিনি বলেন, স্কুলের পাশাপাশি প্রতি শুক্রবার মণিপুরী ভাষা কেন্দ্রে আমাদের মাতৃভাষার বর্ণমালা ভালোভাবে শিখতে পারছি। গর্ব করে বলতে পারি আমি একজন মণিপুরী।
মণিপুরী ভাষা কেন্দ্রের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কনথৌজম শিল্পী বলেন, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে আমাদের মাতৃভাষা ব্যবহার করলেও নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই। এতে আমাদের সন্তানদের কাছে মণিপুরী ভাষা ও বর্ণমালা হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বৃন্দা রানীর স্কুলে মাতৃভাষা পড়তে ও লিখতে পারায় শিশুদের মনে প্রাণ ফিরেছে।
মণিপুরী বর্ণমালা সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জুমের আলী। তিনি বলেন, মণিপুরী শিক্ষার্থী বেশিরভাগেরই নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই। তবে বৃন্দা রানীর স্কুল সীমিত সুযোগের মধ্যে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে মণিপুরী ভাষায় আলোকিত করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ মণিপুরী মুসলিম এডুকেশন ট্রাস্টের সভাপতি লেখক ও গবেষক সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতির অঙ্গীকার পূরণের লক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত মণিপুরীসহ অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের নিজ নিজ ভাষায় পাঠদান চালু করা জরুরি।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সামসুর রহমান বলেন, বৃন্দা রানী নিজ উদ্যোগে মণিপুরী শিক্ষার্থীদেরকে তাদের মাতৃভাষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন। যা পরবর্তী সময়ে তাদের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারবেন।

0Shares

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ