মামলা ও সাজার বেড়াজালে বিএনপি!

প্রকাশিত: ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২৩

মামলা ও সাজার বেড়াজালে বিএনপি!

ডায়াল সিলেট ডেস্ক :: নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ আরও কয়েকটি দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও ঘোষণা আসেনি। দলটি সরকার পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা আছেন অনেকটা ‘দৌড়ের’ ওপর। কারণ, সম্প্রতি দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরনো মামলাগুলোর রায় দিচ্ছেন আদালত। চলতি বছরের ৯ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৩০ মামলায় বিএনপির মোট ৫৪৬ নেতাকর্মীকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মামলা আর সাজার বেড়াজালে আটকে গেছে বিএনপি! বিএনপিকে নির্বাচন বাইরে রাখতেই দ্রুত রায় দেওয়া হচ্ছে।

 

রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারসহ ১২ জনকে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এর মধ্যে আটজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিত উল্লেখযোগ্য অন্য আসামিরা হলেন- ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন আনোয়ার, হায়দার আলী বাবলা, ইমরান, সেন্টু ও নাসুম।

 

রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম জাহাঙ্গীরসহ ৭৫ জনকে পৃথক তিন ধারায় আড়াই বছরের সাজা দিয়েছেন আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। তবে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুজনকে খালাস দেন আদালত। এর আগে, কারাগারে আটক জাহাঙ্গীরসহ তিনজনকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। অন্য ৭৩ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তাদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর হবে না বলে উল্লেখ করেন বিচারক।

 

নাশকতার অভিযোগে ২০১৩ সালের নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় এ মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে পুলিশ ৭৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়।

 

রাজধানীর লালবাগ থানার মামলায় পৃথক দুই ধারায় বিএনপির ৫০ জন নেতাকর্মীকে ৩ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায় তিন মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৪ জনের খালাস দেন আদালত।

 

দণ্ডপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- হাজি আলতাফ হোসেন, মোশারফ হোসেন ওরফে কালা খোকন, জামালুর রহমান চৌধুরী, শফিউদ্দিন আহমেদ সেন্টু, মো. সাইদুল ইসলাম, জিয়ার আলী তাইয়্যন, সাঈদ হোসেন সোহেল ওরফে ক্যাপ সোহেল, হাজি ফয়সাল, আরমান হোসেন বাদল, মো. জুম্মন, ফয়সাল আহম্মেদ, মো. তাজু, মো. রাসেল, রমজান আলী, মো. জিয়া, তাসাদ্দেক হোসেন বাবলু, মো. শামীম ও মুজিবুর রহমান।

 

নাশকতার অভিযোগে ২০১৩ সালের নভেম্বরে রাজধানীর লালবাগ থানায় এ মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে পুলিশ ৭৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়।

 

রাজধানীর বংশাল থানার মামলায় বিএনপির ৬২ নেতাকর্মীকে পৃথক দুই ধারায় সাড়ে তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শেখ সাদী এ রায় ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তাদের অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। নাশকতার অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বংশাল থানায় এ মামলা করা হয়।

 

অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) সভাপতি প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বিজু বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশজুড়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও দ্রুত সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠাচ্ছে। বিষয়টি নিন্দনীয় ও ন্যক্কারজনক। এভাবে দেশ চলতে পারে না। এরকমভাবে গুম-খুন, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার-নির্যাতনসহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালালে দেশে কোনও ভাল মানুষ থাকতে পারবে না। দেশ মেধাশূন্য হয়ে যাবে।

 

তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, শাহজাহান ওমর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আমান উল্লাহ আমান, মো. হাবিবুর রহমান হাবিব, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, আমিনুল ইসলাম, মো. জাকির হোসেন, প্রকৌশলী আহমেদ হোসাইনসহ সকল রাজবন্দিকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।

 

নাশকতাসহ নানা অভিযোগে সম্প্রতি বিএনপির নেতাকর্মীদের সাজা দেওয়ার ঘটনাকে ‘পূর্ব পরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। তারা বলছে, আসছে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এই সাজার রায় দেওয়া হয়েছে।

 

বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল অভিযোগ করে বলেন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে রায় এসেছে তা পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায় যে, মামলাগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের করা হয়েছে এবং এর বিচারও হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। এখানে মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। যাতে করে বিএনপির বিভিন্ন পদের দায়িত্বশীল যারা নেতাকর্মী আছে, তারা যেন রাজনৈতিক হয়রানি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে বিএনপির অনেক নেতা রয়েছেন, যারা এরইমধ্যে সংসদ সদস্য পদে লড়েছেন কিংবা আগামীতে লড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংবিধান অনুসারে তারা যাতে ভবিষ্যতে প্রার্থী হতে না পারে সেজন্যই এই সাজা দেওয়া হয়েছে। আর এই সাজাও হিসাব করে দিয়েছে, দুই বছর এক মাস। অর্থাৎ কনস্টিটিউশনে (সংবিধানে) আছে, দুই বছর যদি কেউ সাজাপ্রাপ্ত হয়, সেই ক্ষেত্রে যাতে এটা অ্যাপ্লাই করতে পারে, সেই জন্যই এটা প্রি-প্ল্যানড, আর্টিকুলেটেড ওয়েতে কাজগুলো করা হয়েছে, হচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, সংবিধান অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি সাজা হলে এবং তার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে কেউ এমপি পদের যোগ্য হবেন না।

 

বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রায়ের বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, দাপ্তরিকভাবে বলতে গেলে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত তাদের অপরাধের প্রমাণ করতে পেরেছে এবং এ কারণেই রায় দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিচারিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, যে রায়গুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ‘অস্বাভাবিক’। বাংলাদেশে ফৌজদারি যত মামলা হয়, সেগুলোর বিচার শেষে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ২০ শতাংশ। আর ৮০ শতাংশ মামলাতেই আসামিরা দোষী সাব্যস্ত হয় না। ওই রকম একটা ওভারঅল প্রেক্ষাপটে বিএনপির সবাই দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে, এটা তো অস্বাভাবিক, সার্টেইনলি অস্বাভাবিক।

 

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০১০ সালে দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৩৬০০ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। গত ১৩ বছর পর এই হত্যাকাণ্ডের কতগুলোর বিচার হয়েছে তার সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও, মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, সেটা ২০ শতাংশের বেশি না। অন্যদিকে, ধর্ষণের অভিযোগে যেসব মামলা দায়ের করা হয়, সেগুলোতেও বিচার হওয়ার হার মাত্র দুই-তিন শতাংশ। এখানে নিশ্চয়ই পুলিশ বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এসব মামলায় যারা সাক্ষী তাদের হাজির করেছে। এতো মামলায় সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করছে, এটা অন্যান্য ফৌজদারি মামলার তুলনায় অস্বাভাবিক।

 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলা দিচ্ছে। এসব করে আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না। জনগণকে সঙ্গে দিয়ে এই সরকারের বিদায় ঘটানো হবে। গত ২৮ ও ২৯ জুলাই হতে অদ্যাবধি কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ১৯ হাজার ১৯৬ জন বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। মোট মামলা হয়েছে ৮০০টির অধিক। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৮০৩ জনকে। বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন ৮ হাজার ১১৯ জনের মতো নেতাকর্মী। ৩০টি মামলায় ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও প্রায় ৫০০-এর অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। একজন সাংবাদিকসহ মারা গেছেন ১৬ জন। আমরা এসব হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তারের নিন্দা ও এসব নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।

 

0Shares