বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করেছে হ্যাকাররা ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত। ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বৃহত্তম চুরির ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইনান্স অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরির কারণে ব্যবহারকারীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা তারা নিজেরাই বহন করবে।এ ঘটনার পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে নেমে আসে।চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক দ্রুত জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে টেথার, সার্কেল এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের মতো স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিসের মতে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে শুরু হওয়া এ সাইবার হামলার মূল অংশটি মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সংঘটিত হয়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে চালানো বড় ধরনের সাইবার হামলাগুলোর সঙ্গে এ ঘটনার মিল রয়েছে।
টিআরএম জানিয়েছে, হামলাকারীরা বাইনান্সের ব্যবহৃত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোকে এমনভাবে নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়, যাতে সেখানকার অর্থ হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে চলে যায়। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো সাইবার হামলার সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।টিআরএম তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলেছে, ‘আমাদের মূল্যায়নে এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার অভিজাত হ্যাকিং ইউনিট দায়ী।’ প্রতিষ্ঠানটি ও চেইন্যালাইসিস-উভয়েই উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে।
‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি’যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে গোয়েন্দাগিরি, আর্থিক চুরি ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে আসছে।
তবে, পিয়ংইয়ং নিয়মিতভাবেই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার মিশন এবং চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাইনান্স জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের কিছু অংশ জব্দ করতে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে তারা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম আবার চালু করার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে, বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের কী অবস্থা, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি বাইনান্স।প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আপনাদের অর্থ নিরাপদ এবং সব ধরনের ক্ষতির দায় আমরা নিচ্ছি। আমাদের তদন্তে এখনো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়নি।’
ক্রিপ্টো বাজারে দরপতনের মধ্যে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের অরবিন্দ শ্রীনিবাসন বলেন, ‘এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা।’
বাইনান্স-এর নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বিএনবির দাম গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়। ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়ে তালিকাভুক্ত এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও।ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ হামলায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অন্যদিকে বিটকয়েন কেনার জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাত?বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে হ্যাকাররা বিন্যান্সের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলন করে।
বাইনান্স জানিয়েছে, ‘হ্যাক হওয়া কম্পিউটারটি এ ঘটনার প্রবেশপথ হয়ে থাকতে পারে। আমাদের নিরাপত্তা দল ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে পুরো হামলার গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।’
টোকিওভিত্তিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের মতে, হ্যাকাররা সম্ভবত বাইনান্স অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি হাতিয়ে নিতে পেরেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সাইবার হামলার প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মধ্যে ছিল ক্রিপ্টো বাজার।
হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, ‘এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আরও কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জগুলোতে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।’
চুরির পরিমাণ ছাড়াল বাইনান্সের নিরাপত্তা তহবিল
বাইনান্স ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেনের সুযোগ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তাদের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। গ্রাহকদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
সাইবার হামলা বা নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় বাইনান্সের একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা সাফু নামে পরিচিত এ তহবিলে সম্পূর্ণ বিটকয়েন আকারে ১০০ কোটি ডলার সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের ক্ষতি পূরণে ওই তহবিলের পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব অর্থও ব্যবহার করা হবে।
স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে। সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, সম্পদ জব্দ করতে তারা কাস্টোডিয়ান প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে জানিয়েছেন, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং প্রায় ২০ লাখ ডলারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে জানান তিনি।
ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে ধারাবাহিক সাইবার চুরির সর্বশেষ ঘটনা এটি। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেট জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে। এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও সামনে এনেছে।