৭ কোটি বছর আগের কঙ্কাল বিক্রি হলো ৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে

টাইরানোসরাস রেক্সের (টি-রেক্স) বাচ্চা বলে ভুল করা হয়েছিল এই ডাইনোসরের কঙ্কালকে। পরে আরও গবেষণা করে দেখা গেল, এটি স্বতন্ত্র এক প্রজাতি। ডাইনোসর ন্যানোটাইরানাস এটি। প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ দিকে এই মাংসাশী ডাইনোসরগুলো দেখা গিয়েছিল।

প্রায় ৩ মিটার (১০ ফুট) উঁচু কঙ্কালটির ডাকনাম ‘জোডি’। গত বছরের অক্টোবর মাসে মার্কিন গবেষকেরা নিশ্চিত করেন যে কঙ্কালটি স্বতন্ত্র প্রজাতির ডাইনোসরের।

মঙ্গলবার ( ২৭ অক্টোবর ) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সোথেবি’স কঙ্কালটি নিলামে তোলে। এটিই প্রথম বাজারে আসা ন্যানোটাইরানাসের কঙ্কাল বলে জানিয়েছে সোথেবি’স। কঙ্কালটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে।

নিলামে তোলার আগে কঙ্কালটির দাম অন্তত ৯০ লাখ ডলার উঠতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এর আগে গত জুলাইয়ে ‘গাস’ নামে একটি টাইরানোসরাস রেক্সের কঙ্কাল ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে বিক্রি করে রেকর্ড গড়েছিল সোথেবি’স।

এ দিকে জোডির বিক্রি আবারও বৈজ্ঞানিক মহলে বিতর্ক উসকে দিয়েছে যে ডাইনোসরের জীবাশ্ম ব্যক্তিমালিকানায় বিক্রি করা উচিত, নাকি সেগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করা উচিত।

সোথেবি’স জোডিকে ‘প্রদর্শনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, চমৎকার একটি কঙ্কাল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এতে জীবাশ্মে পরিণত হওয়া হাড়ের প্রায় ১৯১টি অংশ রয়েছে। এর খুলি প্রায় সম্পূর্ণ এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত বলেও জানিয়েছে নিলামকারী প্রতিষ্ঠানটি।

সোথেবি’সের ভাষ্য, ন্যানোটাইরানাসের এমন কঙ্কাল এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানের জগতে মাত্র তিনটি পরিচিত। গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা ন্যানোটাইরানাসের স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে অস্তিত্ব নিশ্চিত করার পর এই প্রথম এমন কোনো নমুনা নিলামে উঠল।

নিলামে ছয়জন আগ্রহী ক্রেতার মধ্যে টানা ১২ মিনিট দর-কষাকষির পর একজন সর্বোচ্চ দরদাতা কঙ্কালটি কিনে নেন। তবে ক্রেতার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

বিক্রির অঙ্কের হিসাবে জোডি এখন পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হওয়া ডাইনোসরের জীবাশ্মগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি। প্রথম স্থানে রয়েছে গাস। তৃতীয় স্থানে আছে ‘এপেক্স’ নামে একটি স্টেগোসরাসের জীবাশ্ম, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সোথেবি’সের নিলামে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের জীবাশ্মবিদ মেগান জ্যাকবস মঙ্গলবার বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ন্যানোটাইরানাসকে টি-রেক্সের একধরনের কৈশোরকালীন রূপ বলে মনে করা হতো।

তবে জ্যাকবসের ভাষায়, ন্যানোটাইরানাস আকারে অনেক ছোট এবং গড়নেও বেশি ছিপছিপে। এটি দেখতে বেশ মসৃণ ও সরু। এর দাঁতও ছুরির ফলার মতো, যা দিয়ে মাংস কেটে খাওয়া যেত।

টাইরানোসরাস রেক্স ও ন্যানোটাইরানাস একই ভূতাত্ত্বিক যুগে, প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে, পাশাপাশি বসবাস করত।

২০২৩ সালের অক্টোবরে লন্ডনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিল্পমেলা ফ্রিজ মাস্টার্সে জোডির কঙ্কালটি প্রথম প্রদর্শন করা হয়েছিল। তখন এটিকে অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ন্যানোটাইরানাসকে স্বতন্ত্র গণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার আগেই এটি প্রদর্শিত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যে হেল ক্রিক ফরমেশনের একটি জমিতে কঙ্কালটি আবিষ্কার করেন খামারমালিক জোডি পিয়ারসন। ভূতাত্ত্বিক এই স্থানটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক গবেষণা চলছে। পরে বাণিজ্যিক জীবাশ্মবিদ ক্লেটন ফিপস কঙ্কালটি খনন করে উদ্ধার করেন।

ফিপসই বিখ্যাত ‘ডুয়েলিং ডাইনোসরস’ জীবাশ্মটিও আবিষ্কার করেছিলেন। ২০০৬ সালে জোডির কঙ্কাল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ওই জীবাশ্মটি পাওয়া যায়। এতে ন্যানোটাইরানাস ও ট্রাইসেরাটপসের জীবাশ্ম দেখে মনে হয়, প্রাণী দুটি লড়াইরত ছিল।

‘ডুয়েলিং ডাইনোসরস’ আবিষ্কারটি ন্যানোটাইরানাসকে টি-রেক্স থেকে আলাদা গণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লিন্ডসে জানো ও জেমস নাপোলি এ বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁদের গবেষণার মধ্য দিয়ে ডাইনোসর দুটি স্বতন্ত্র কি না, তা নিয়ে কয়েক দশকের বিতর্কের অবসান ঘটে।