১৩ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চলে গেলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

দেহটাও দান করে গেছেন ডা. জাফরুল্লাহ

 

ডায়াল সিলেট ডেস্ক :: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার নিজের প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

 

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মামুন মোস্তাফী মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

 

৮২ বছর বয়সী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বুধবার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়।

 

ডা. জাফরুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর কিডনি সমস্যার পাশপাশি লিভারের সমস্যাও দেখা দেয় তার। এ ছাড়া তিনি অপুষ্টিসহ সেপটিসেমিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।

 

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে ভারতের আগরতলায় গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে তা পরিচালনা করেন।

 

১৯৮২ সালে তার উদ্যোগে জাতীয় ওষুধ নীতি ঘোষণা করা হয়। এ অবদানের জন্য জানুয়ারি মাসে লন্ডন ভিত্তিক সংগঠন ‘ব্রিটানিয়া ইকোনমিকাল সাপোর্ট ট্রাস্ট’ থেকে সম্মাননা পান তিনি।

 

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে দীর্ঘ ৫১ বছর দেশের গরিব অসহায়দের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা, গরিবদের সাহায্যের জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি করে মানবতার ফেরিওয়ালা হয়েছেন।

 

ডা. জাফরুল্লাহর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। বাবা-মাযের দশ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়।

 

ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণের পর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

 

তার বাবা হুমায়ন মোর্শেদ চৌধুরীর শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। হুমায়ন মোর্শেদ চৌধুরী কলকাতা ও ঢাকার কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। মা হাছিনা বেগম চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী।

 

দেহটাও দান করে গেছেন ডা. জাফরুল্লাহ :: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সদ্য প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সবসময় চেষ্টা করেছেন দেশের ভালোর জন্য কিছু করার। চেষ্টা করেছেন নিজেকে উজার করে দেয়ার। মরণোত্তর দেহদানের মাধ্যমে নিজের শরীরকেও তিনি মানুষের কল্যাণেই বিলিয়ে দিয়ে গেছেন।

 

আগেই থেকেই ভুগতে থাকা কিডনি জটিলতার পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর কেন্দ্রে সোমবারই লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়েছিল ডা. জাফরুল্লাহকে। মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টায় সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

 

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে আল মারকাজুলে নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহর মরদেহ গোসল করানো হচ্ছে। এরপর মরদেহটি বারডেম হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হবে।

 

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মরণোত্তর দেহদান করে গিয়েছিলেন বলে জানান তার পরিবারের সদস্য সামিয়া। তিনি বলেন, তিনি পরিবারের সম্মতি নিয়েই রেখেছিলেন। সে অনুযায়ীই সবকিছু হবে। আজ রাতে (মঙ্গলবার দিবাগত রাত) মরদেহ বারডেমের মরচুরিয়াতে রাখা হবে। কাল (বুধবার) সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

পেশায় চিকিৎসক ডা. জাফরুল্লাহ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলার মাধ্যমে যুদ্ধকালীন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়েছেন, অনেকের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর চিকিৎসা গবেষণা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের কাজ করে গেছেন। জাতীয় ওষুধ নীতি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নেও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের মাধ্যমে সুলভে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।

 

সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত না হলেও আজীবন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ। গণমুখী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সংহতি-সমর্থন দিয়ে গেছেন। জাতীয় জীবনে অবদান রাখার জন্য সেই ১৯৭৭ সালেই স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি।

 

একনজরে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। তিনি চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য সক্রিয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামক স্বাস্থ্য বিষয়ক এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

জাফরুল্লাহর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পিতামাতার দশজন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড় । ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণের পর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

 

বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস-এ এফআরসিএস পড়াকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি চূড়ান্ত পর্ব শেষ না-করে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার নিমিত্তে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং এরপরে ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য জ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তারা রোগীদের সেবা করতেন এবং তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়।

 

স্বাধীন দেশে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন গণমানুষের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের করেছেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মী। প্রথম উদ্যোগ নিয়েছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের। জনকল্যাণধর্মী চিকিৎসানীতির মাধ্যমে দেশে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি প্রণয়ন, জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে অগ্রসর শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও নারী উন্নয়নে রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। সরকার ও রাষ্ট্রের, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছেন বুকচিতিয়ে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, অনিশ্চিত তখনই বিবদমান পক্ষের মাঝখানে সমঝোতার সেতুর ভূমিকা নিয়েছেন।

 

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ফিলিপাইন থেকে রামন ম্যাগসাইসাই (১৯৮৫) এবং সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসাবে পরিচিত রাইট লাভলিহুড (১৯৯২), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ (২০০২) এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন।