ডায়াল সিলেট ডেস্ক ॥ ‘যে চাল আগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে কিনেছি, সেই চাল এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি। চিনি ১১৫ টাকা ও মসুরডাল ১২০ টাকা কেজি। আমি সারা দিন কাজ করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, আলু কেনা সম্ভব নয়।’ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে এভাবেই হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার শহরের কাশিনাথরোড এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জলিল।
আব্দুল জলিল পেশায় বিদ্যুৎ মিস্ত্রি। পরিবারে তিন ছেলে-মেয়েসহ মোট পাঁচজন। এলাকার একটি মুদি দোকানে পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি আলু, ৫০০ গ্রাম চিনি ও মসুরডাল কিনতে এসেছেন। কিন্তু তিনি যে টাকা সঙ্গে এনেছিলেন, তা দিয়ে চাহিদামতো পণ্য কিনতে পারেননি। দুই কেজি চাল ও এক কেজি আলু নিয়ে ফিরতে হয়েছে বাসায়।
শহরের সৈয়ারপুর এলাকার রিকশাচালক নজরুল মিয়া বলেন, ‘আগে এলাকার ছোট হোটেলে ২০ থেকে ২৫ টাকায় সকালের নাশতা করে রিকশা নিয়ে বের হতাম। এখন সেই নাশতা করতে ৪০ টাকা লাগে। আমাদের আয় বাড়ছে না, কিন্তু সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে। আমরা বাঁচব কী করে।’
নজরুল মিয়া ও আব্দুল জলিলের মতো একই অবস্থা শহরের নিম্ন আয়ের সব মানুষের। পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিত্যপণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্তরাও। মাস দুয়েকের ব্যবধানে মৌলভীবাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। চাল, ডাল, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, শাকসবজি, মাছ মাংস সবকিছুরই দাম বাড়ছে প্রতিনিয়তই।
স্বল্প আয়ের মানুষের খেয়ে বেঁচে থাকাটা দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়ছে জানান শহরের শান্তিবাগ এলাকার লিটন দেব। পেশায় তিনি বেসরকারি চাকুরিজীবী। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। তারপরও এখন সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। করোনাকালেও জিনিসপত্রের এত দাম বাড়েনি। মাছ বা মাংস খেতে হলে একটিবার চিন্তা করতে হয়। ৫০ টাকা কেজির নিচে কোনো সবজিও পাওয়া যায় না।’
বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয় জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুল শিক্ষক বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর যেভাবে দাম বেড়েছে। কিভাবে সংসারের খরচ চালাবো বুঝে উঠতে পারছি না। মাসশেষে যে টাকা বেতন পাই সেই টাকা দিয়ে পাঁচজনের সংসারে খাবার খরচ আর বাসা ভাড়া দিতেই হিমসিম খাচ্ছি।’
সোমবার (৬ মার্চ) জেলা শহরের পশ্চিমবাজার, টিসি মার্কেট, চাঁদনীঘাটসহ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে জানা যায়, সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, ময়দা, মাছ, মাংসের পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম চড়া থাকায় বিপাকে পড়েছেন নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তরা। সেই সব পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এভাবে বৃদ্ধি হলে সংসার চালানো দুরূহ হবে বলে জানান অনেকেই।
এছাড়া, জেলার বাজারগুলোতে দোকানে পণ্যের মূল্য তালিকা টাঙানোর কথা থাকলেও বেশির ভাগ ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। ফলে প্রতিদিন পণ্যের দাম নিয়ে পড়তে হয় দ্বিধায়।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব ধরণের সবজি আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টমেটো প্রতি কেজি ৩০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা, শসা কেজি ৪০ টাকা, প্রতি কেজি গোল বেগুন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, লেবু প্রতি হালি ৪০ থেকে ৮০ টাকা, গাজর ৪৫ কেজি, বাঁধাকপি ২৫ টাকা ও ফুলকপি ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় প্রতিটি সবজিতে দাম বেড়েছে।
খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৯০ টাকা, পামওয়েল ১৪০ টাকা, সরিষার তেল ৩৬০ টাকা ও প্রতি কেজি চিনি ১১৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি মুসুর ডাল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আটা ও ময়দাতে কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২৫ কেজির প্রতি বস্তা চালে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা বেড়েছে। এছাড়াও চিড়া, মুড়িসহ সকল ধরনের বিস্কুটের দাম বেড়েছে।
জেলার টিসি মার্কেট এলাকার খুচরা বাজারের ব্যবসায়ী রাজন আহমন বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করে অনেক বিপদে পড়েছি। ব্যবসায় আগের চেয়ে অনেক বেশি পুঁজি লাগছে, কিন্তু লাভ বাড়েনি। পাইকারি বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও কিছুটা দাম বেড়েছে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আল আমিন বলেন, ‘বাজার তদারকি করছি। কেউ যাতে দাম অতিরিক্ত বাড়াতে না পরে সেদিকে আমাদের নজরদারি আছে।’