১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সংসদে আছেন, সঙ্কটে নেই সুলতান মনসুর!

স্টাফ রিপোর্টার: আওয়ামী লীগের এক সময়কার প্রভাবশালী নেতা সুলতান মনসুর সংস্কারপন্থী হিসেবে রাজনীতির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়েন। দীর্ঘদিন পর একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরীক দল গণফোরামের নেতা হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বৈরি স্রোতে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসন নির্বাচিত হন তিনি। জয়ী হওয়ার পর শপথ নিয়ে করেন নানা নাটকীয়তা। নানা নাটকীয়তা শেষে সংসদে যোগ দেন। সৌভাগ্যমান বিরোধী আট সংসদ সদস্যের মধ্যে বিএনপি বলয়ে জোটে মনমালিন্য, দুরুত্ব তৈরি করে তিনিই প্রথম সংসদে যোগ দিয়েছিলেন।
শপথ গ্রহণ শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এলাকার জনগণের স্বার্থে, তাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার আশা-প্রত্যাশা পুরণ করতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আমি শপথ করেছি।’
সেই সুলতান শুধুমাত্র সংসদেই আছেন। কোনো সষ্কটে নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ তাকে কাছে পায়নি। সুলতান মনসুরের শপথ নেয়ার বেশ কিছুদিন পর কুলাউড়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা ঘটে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক ব্যক্তি। ওইসময় একাধিক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কিন্তু দেখা মেলেনি স্থানীয় সংসদস সদস্য সুলতান মনসুরের। তিনি ছিলেন তখন ঢাকায়।
এমনকি করোনা মহামারিতে সুলতান মনসুর এলাকায় যাননি। কোনো ত্রাণও বিতরণ করেননি। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখান। যদিও আশপাশের সকল এমপি নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন স্থানীয় প্রশাসনকে।
করোনাকালে সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর একজন ত্রাণপ্রত্যাশীকে হাকালুকি হাওরে ডুবে মরতে বললেন। দুর্যোগের কথা জানিয়ে ত্রাণসামগ্রী চাইলে নিজ এলাকার এক অসহায় ব্যক্তিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। এ নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সম্প্রতি অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় সুলতান মনসুরের নির্বাচনী এলাকা কুলাউড়ায় উপজেলা পরিষদসহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পানি উঠে গেছে। প্রায় ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সাতটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। নদ-নদীসহ হাকালুকি হাওরের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূকশিমইল, ভাটেরা, জয়চন্ডী, ব্রাহ্মণবাজার, কাদিপুর, ও কুলাউড়া সদরসহ সাতটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত।
এবারও কুলাউড়ার মানুষের পাশে নেই সুলতান মনসুর। এবারও তিনি ঢাকায়। সংসদ সদস্য সুলতান মনসুরের ঘনিষ্ঠ একজন জানিয়েছেন, সরকারি যা আসবে তাই, এর বাইরে কিছু নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুলতান মনসুরের আরেক ঘনিষ্ঠ নেতা বলেন, ‘সবকিছু মিলিয়ে আগামী নির্বাচনে তার পক্ষে ভোটের রাজনীতি করা কঠিন হবে। রাজনৈতিকভাবে কিছুটা অসহায় অবস্থায় আছেন তিনি।’
অন্য এক প্রসঙ্গে এমপির এই ঘনিষ্টজন আরও বলেন, ‘সংস্কারপন্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে বের হয়ে যেতে হয়েছে। আর গত নির্বাচনে বিএনপির মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে জয়ী হলেও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রথম শপথ নেন। সে কারণে এ অংশের (বিএনপি) সঙ্গেও তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আওয়ামী লীগ কি তাকে ফিরিয়ে নেবে, সম্ভবত না। এছাড়া বয়সও হয়েছে।’
কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল বলেন, ‘সুলতান মনসুরের এমন কর্মকাণ্ডে আমরা হতাশ। এমপির এমন আচরণ-নীরবতা কুলাউড়ার জনগণ অতন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করবে।’
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদিন বাচ্চু বলেন, ‘এমপি-লীগ বা এমপি-দল নিয়ে এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন সুলতান মনসুর। স্থানীয় আওয়ামী লীগও নেই, বিএনপিও নেই সুলতান মনসুরের পক্ষে। সামাজিক-রাজনৈতিক কোনো কাজেই তাকে দেখা যায় না। তিনি শুধু কুলাউড়ার এমপি। সংসদীয় এলাকার কোনো দাপ্তরিক কাজ থাকলে সেটা তিনি ঢাকায় বসে ফেসবুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন।’
কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম রেনু বলেন, ‘সুলতান মনসুর একজন দায়িত্বহীন মানুষ। ট্রেন দুর্ঘটনা, করোনা, বন্যায় দেখা মেলে না বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের এই এমপির। তিনি জনগণের এমপি নন, ফ্যাশনের এমপি। আমি কিছু বলেলেই সেটা খারাপ হয়ে যায়।’
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে সুলাতন মনসুরের মুঠোফোনে সোমবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করলে তার ব্যক্তিগত নাম্বার বন্ধ পাওয়া য়ায়। পরদিন যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। আজ বুধবার তিনি ফোন রিসিভ করলেও সংসদে আছেন এবং কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।
একটি সূত্র জানায়, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বহিষ্কার হয়ে সাবেক দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে তার। কিন্তু নিজ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়েছেন। স্থানীয় বিএনপির অল্পকিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।