লাশের রাজনীতি বসুরহাটে আতঙ্ক

dial dial

sylhet

প্রকাশিত: ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২১

ডায়ালসিলেট ডেস্ক;;মাস না পেরুতেই আবারো রক্ত ঝরেছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটে। রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে বসুরহাটের দুই গ্রুপ। আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মঙ্গলবার রাতে প্রাণ গেছে একজনের। সংঘর্ষের পর থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বসুরহাটে। বারবার রক্তারক্তি ও লাশের রাজনীতির কারণে আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে বসুরহাট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৮ জনকে।

সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার রাতে বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে।

স্থানীয়রা জানান, আগের দিন সোমবার বসুরহাট রূপালী চত্বরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান তার নিজস্ব ঘরের ভেতরে আওয়ামী লীগের উপজেলা কার্যালয় উদ্বোধন করতে যান। খবর পেয়ে বসুরহাট পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে বাধা দেন। এ সময় বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা তাদের বের হয়ে যেতে বললে খিজির হায়াত খানের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা বের হয়ে যায়। এসময় আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তখনও খিজির হায়াত খান ওই ঘরে বসে ছিলেন। মেয়র আবদুল কাদের মির্জা তখন ওই ঘরে ঢুকে খিজির হায়াত খানকে চলে যেতে বলেন। এখানে বসে থাকলে হট্টগোল হবে বলে জানান তিনি। একপর্যায়ে মেয়র মির্জা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ওই ঘর থেকে বের করে রিকশায় উঠিয়ে দেন। এ সময় নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হলে কাদের মির্জা তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন।

কিছুক্ষণ পরেই পাঞ্জাবি ছেঁড়া অবস্থায় ফেসবুকে খিজির হায়াতের ছবি ছড়িয়ে পড়লে তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বসুরহাটে প্রতিবাদ সভা ডাকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। ওই সভাকে কেন্দ্র করে বিকালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দফায় দফায় রাত পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলে।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ও থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। একপর্যায়ে খিজির হায়াতের কর্মীরা ধাওয়ার শিকার হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার সামনে অবস্থান নেন। সেখানে তারা বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকে। রাত ৮টার দিকে কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে খিজির হায়াতের সমর্থকেরা বসুরহাটে পৌঁছে লাঠিসোটা নিয়ে বসুরহাট বাজারের প্রধান প্রধান সড়কে মিছিল বের করে। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে কয়েক রাউন্ড গুলি ও ভাঙচুর চালানো হয়।

রাত সাড়ে ৯টায় বসুরহাট পৌরসভা কার্যালয়ে মিজানুর রহমান বাদল ও খিজির হায়াত খান সমর্থিত শতাধিক নেতাকর্মী হামলা করে। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গুলিতে বিভিন্ন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেকে গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। এ সময় পৌর মেয়র আবদুর কাদের মির্জাকে নেতাকর্মীরা মানবপ্রাচীর তৈরি করে রক্ষা করেন।

সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৩ জন গুলিবিদ্ধসহ ৬০ নেতাকর্মী আহত হন। গুলিবিদ্ধ ২৭ বছর বয়সী মো. আলাউদ্দিনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যান। নিহত মো. আলাউদ্দিন কোম্পানীগঞ্জের চর ফকিরার মমিনুল হকের পুত্র।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ এ ঘটনায় ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। আহত ১২ জনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন হৃদয়সহ আশঙ্কাজনক সাত জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত অন্যদের কোম্পানীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে র‌্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। সংঘর্ষের পর গতকাল বুধবার বসুরহাট পৌরসভায় ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে।

সংঘর্ষের সূত্রপাত সম্পর্কে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান বলেন, আবদুল কাদের মির্জা আমার ঘর থেকে জোরপূর্বক আমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যান। এসময় তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা আমাকে মারধর করেছে। তবে খিজির হায়াতের অভিযোগ সত্য না দাবি করে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা বলেন, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বের করেছি এবং কোনো নেতাকর্মী তার গায়ে যেন হাত না দেয় বারবার সতর্ক করে সরিয়ে দিয়েছি। এরপর নিরাপদে তাকে একটি রিকশায় তুলে দিয়েছি।

সংঘর্ষের ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জাহেদুল হক রনিন জানান, পুলিশের ওপর হামলা, বিস্ফোরণের ঘটনায় ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে ২৫০ জনকে আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খানের সহধর্মিণী আরজুমান পারভীন বাদী হয়ে ১০৫ জনের নামে আরেকটি মামলা করেছেন।

সংঘর্ষের পর ২৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলো, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বজু মিয়ার ছেলে মিল্টন (২৯), ফেন্সি লিটন (৩৬), আবু নাছের (৩৫), মো. বাহাদুর (৩০), মোছলে উদ্দিন (২৪), আলমগীর (২৮), আবদুল মালেক (৩০), মো. রাহাত (৩৯), আবদুল আমিন (২৫), আনোয়ার হোসেন (৪০), আজিজুল হক (৩৯), মোশারেফ হোসেন (৩৭), শাহাব উদ্দিন (২৭), আবদুল হাই ( ২২), নোবেল (২৯), সুজায়েত উল্যাহ (২৭), সুমন (৩৬), মিনার (২৬), ফয়েজ উল্যাহ (২৩), বিক্রম (২৮), পায়েল (২০), ফয়সল (৩২), আরমান (৩৯), হৃদয় (২৪), সজীব (২৪), আকাশ (২৬), আনোয়ারুল ইসলাম (৩৯)।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি উপজেলার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির গুলিবিদ্ধ হন, পরদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

0Shares