ডায়াল সিলেট ডেস্কঃ-
মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে দীর্ঘসূত্রিতা করা হয়েছে সিলেটের পুলিশ হেফাজতে নিহত রায়হান হত্যার মামলায়। হাইকোর্ট ৭ এপ্রিল ২০২৪ তারিখের মধ্যে মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা বিচারিক আদালত পালন করেনি।
ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ আইনজীবীরা বলেছেন, এই আদেশ অমান্য করার মাধ্যমে বিচারিক আদালত বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন। এর ফলে মামলার প্রধান আসামী এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার জামিনে মুক্তি পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি এস.এম. কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি শাহেদ নুর উদ্দিন ১৪ আগস্ট ২০২৩ তারিখে ফৌজদারী বিবিধ মামলা নং ৪৭৩৯৯/২০২৩-এ সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতকে ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। রায়হান হত্যা মামলা (দায়রা মামলা নং-৬২০/২০২২)এর ৭৯ নং আদেশে (০৮/১০/২০২৩ তারিখ) এ নির্দেশনা সংযুক্ত রয়েছে। তখন আদালতের বিচারক ছিলেন এম. নাসির উদ্দিন। তার কর্মকালের মধ্যে নির্দেশনার ছয় মাসের মেয়াদ ৭ এপ্রিল ২০২৪-এ শেষ হয়। এর পর আওয়ামী লীগের সরকার পতন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় ১৬ মাস অতিবাহিত হয়। মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলা পরিচালনায় কোনো পরিবর্তন বা ত্বরান্বিত গতি দেখা যায়নি।
এই অবস্থায় ৪ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে অতি গোপনে জামিন পান মামলার প্রধান আসামী এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। ১০ আগস্ট মহানগর দায়রা জজ আদালতে তার জামিন আদেশের নথি পৌঁছায়। একই দিন শুনানি হয়; ১২৪ নং আদেশে ধার্য করা হয় ২০ হাজার টাকার বন্ড। ১২৫ নং আদেশে বন্ড দাখিলের পর মুক্তিপত্র ইস্যু হয়। সন্ধ্যায় আকবর হোসেন ভূঁইয়া কারাগার থেকে মুক্ত হন। পরদিন ১১ আগস্ট বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সিলেটসহ সারাদেশে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিনহাজ উদ্দিন গাজী বলেন, রায়হান হত্যা মামলার ঘটনা স্পষ্টভাবে বিচারিক অনিয়মের মধ্যে পড়ে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অবশ্যই নিম্ন আদালতকে মানতে হবে। এখানে সেই আইন বেমালুম লঙ্ঘন করা হয়েছে। আর সেই লঙ্ঘনের ফলে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার মতো অপরাধীর জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, শুধুমাত্র এ মামলায় নয়, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করা এখন প্রায় সব মামলায় দেখা যাচ্ছে। এটি বিচার বিভাগের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রায়হান হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আরও দায়িত্বশীল হওয়া নৈতিকভাবে উচিত ছিল।
রায়হান হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. এ. ফজল চৌধুরী দাবি করেন, এ মামালার প্রতি ধার্য্য তারিখে তিনি হাইকোর্টের নির্দেশনা আদালতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে। ফলস্বরূপ, মামলার প্রধান আসামী জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে।
তিনি আরও জানান, কিছু সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে আকবর হোসেন ভূঁইয়া দেশ থেকে পালিয়েছেন। এটি সত্য হলে রায়হানের পরিবারের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য কী হতে পারে।
সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট বদরুল ইসলাম বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলাটি সাক্ষ্য থেকে যুক্তিতর্ক পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। এই মুহূর্তে হাইকোর্ট যদি কোন আসামীর জামিন দেয়, তবে মহানগর দায়রা জজ আদালতের কিছু করার নেই। তবে এ মামলায় হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়টি তার দায়িত্ব গ্রহণের ৮ মাসের মধ্যে নজরে আসেনি।
এর আগে ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। ১১ অক্টোবর তার মৃত্যু ঘটে। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর (নিবারণ) এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী মামলা দায়ের করেন। সিলেট মহানগর পুলিশের অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়িতে নির্যাতনের সত্যতা পান। ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া সহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে পিবিআই কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযোগপত্রে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে (৩২) প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য অভিযুক্তরা হলেন সহকারী উপপরিদর্শক আশেক এলাহী (৪৩), কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ (৩২), টিটু চন্দ্র দাস (৩৮), ফাঁড়ির ‘টু-আইসি’ পদে থাকা এসআই মো. হাসান উদ্দিন (৩২) ও আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান (৩২)।