আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের পোস্ট ৫০ মিলিসেকেন্ড আগে দেখতে লাখ ডলারে চুক্তি ব্লুমবার্গসহ ৩ প্রতিষ্ঠানের

ট্রাম্পের পোস্ট ৫০ মিলিসেকেন্ড আগে দেখতে লাখ ডলারে চুক্তি ব্লুমবার্গসহ ৩ প্রতিষ্ঠানের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল তাঁর পোস্টে দ্রুত প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য সংবাদ ও তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ এবং ওয়াল স্ট্রিটের দুই ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এ সেবার জন্য মাসে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলার পর্যন্ত নিচ্ছে ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (টিএমটিজি)। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

চুক্তিবদ্ধ দুই ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান হলো সুসকেহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ ও জাম্প ট্রেডিং। প্রতিষ্ঠান দুটি উচ্চগতির ও অ্যালগরিদমনির্ভর স্বয়ংক্রিয় লেনদেনে বিশেষজ্ঞ।

ট্রুথ এপিআই নামের এ সেবার মাধ্যমে গ্রাহকেরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের তুলনায় দ্রুত ট্রাম্পের পোস্ট দেখতে পারেন। টিএমটিজির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ মিলিসেকেন্ডের সময়গত সুবিধা পাওয়া যায়। আর্থিক বাজারে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রভাব থাকায় এ সুবিধা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চগতির ট্রেডিংয়ে ব্যবহৃত সফটওয়্যার সংবাদ শিরোনাম, কোম্পানির ঘোষণা ও সরকারি বিবৃতি বিশ্লেষণ করে মুহূর্তের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে। গত এপ্রিলে ইরান যুদ্ধের মধ্যে ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর তেলের ফিউচারসের দাম কমে যাওয়ার ঘটনা এ ধরনের পোস্টের বাজারে প্রভাবের উদাহরণ।

টিএমটিজি গত জুলাইয়ে দ্রুত প্রবেশাধিকার দেওয়ার এ সেবা চালুর ঘোষণা দিয়ে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থার কাছে এটি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। গত আগস্টে বিনিয়োগকারীদের প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, তারা ১০ টির বেশি গ্রাহক চুক্তি করেছে। তবে রয়টার্স এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। কোম্পানিটি গ্রাহকদের নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছিল, তাদের অধিকাংশই ওয়াল স্ট্রিটের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান।

ব্লুমবার্গ, জাম্প ট্রেডিং ও সুসকেহানা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আর্থিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তারা সেবাটি মূল্যায়ন করবে, তবে বর্তমানে সাবস্ক্রাইব করার পরিকল্পনা নেই।

ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে দ্রুত প্রবেশাধিকার বিক্রির এ উদ্যোগ নিয়ে নৈতিকতা ও আইনি প্রশ্ন উঠেছে। গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও অ্যাডাম শিফ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি) সেবাটি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করছে কি না, তা তদন্তের অনুরোধ জানান। তাঁরা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টিকে ‘চমকে দেওয়ার মতো ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে বর্ণনা করেন। এসইসি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এদিকে, ইন্টারসেপ্ট মিডিয়া ও অলাভজনক ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ফাউন্ডেশন গত আগস্টে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় হোয়াইট হাউসের সরকারি ঘোষণা একচেটিয়াভাবে ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ বন্ধের আবেদন জানানো হয়েছে, কারণ প্ল্যাটফর্মটিতে অর্থের বিনিময়ে দ্রুত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, সরকারি তথ্যে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আর্থিক বাধা তৈরি করা অসাংবিধানিক হতে পারে এবং এতে ধনী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ সুবিধা পায়। মামলায় আরও বলা হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার এ ব্যবস্থা জনসাধারণের প্রথম সংশোধনীতে স্বীকৃত অধিকার এবং আইনে নিশ্চিত তথ্যের সমান প্রবেশাধিকারের জন্য ‘অযৌক্তিক অঙ্কের অর্থ’ নেওয়ার মাধ্যমে পঞ্চম সংশোধনীও লঙ্ঘন করতে পারে। মামলাটি এখনো চলমান।

ট্রাম্পের পারিবারিক ট্রাস্টের হাতে টিএমটিজির ৪১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এবং ট্রাম্প ওই ট্রাস্টের একমাত্র সুবিধাভোগী। কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথিতে ট্রাম্প জুনিয়রকে ট্রাস্টের ট্রাস্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ট্রাস্টের ভোটাধিকার ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা তাঁর হাতে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল বলেছেন, ট্রাম্প বা তাঁর পরিবারের কেউ সরাসরি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন না। তবে প্রেসিডেন্ট নিজের পদ অনুচিতভাবে ব্যবহার করছেন বলে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি। ট্রাম্প জুনিয়র এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয়নি।

টিএমটিজি এক বিবৃতিতে বলেছে, ট্রুথ সোশ্যাল বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য চাহিদাসম্পন্ন শিল্পমানের এপিআই সেবা দেয় এবং তারা গ্রাহকদের গোপনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়। কোম্পানিটির দাবি, বেনামি সূত্রের বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি করা।

চলতি বছরে টিএমটিজির শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। ২০২৪ সালের মার্চে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় কোম্পানিটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারে। ২০২৪ সাল থেকে কোম্পানিটি প্রায় ১৭৬ কোটি ডলার লোকসান করেছে, যার মধ্যে নগদ অর্থের সরাসরি বহিঃপ্রবাহ ছাড়াই হিসাবভুক্ত লোকসানও রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ইংল মামলার অভিযোগের সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করেন। এ কারণেই জনগণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তাঁকে আবারও এই পদে নির্বাচিত করেছে।’