যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে ভুয়া জরিপের ছড়াছড়ি, প্রভাব পড়বে ভোটে?

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভুয়া জনমত জরিপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনি লড়াই নিয়ে কাল্পনিক জরিপ প্রকাশ করেছে। এসব জরিপের কিছু জায়গা পেয়েছে সংবাদমাধ্যম ও জনমত জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও।এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভুয়া জরিপের মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করা সম্ভব।সাম্প্রতিক এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে ওয়েজউড পোলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

চলতি মাসের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বীকার করে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য নিয়ে প্রকাশিত তাদের জরিপের তথ্য ভুয়া ছিল।টেক্সাস, ওহাইও, মিশিগান, কানসাস ও মেইনের মতো অঙ্গরাজ্য নিয়ে এসব জরিপ প্রকাশ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।ওয়েজউড পোলস দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপশিল্পে তদারকির অভাব এবং তথ্য যাচাইয়ের দুর্বলতা তুলে ধরতেই তারা পরীক্ষামূলকভাবে এ কাজ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, জরিপ ও গবেষণা খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখেছে, যাচাইহীন ও নিম্নমানের পদ্ধতির কারণে জনমত জরিপের ওপর মানুষের আস্থা কমছে।তাদের দাবি, ভুয়া জরিপ কত সহজে ভোটার ও সংবাদমাধ্যমের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, সেটিই পরীক্ষা করতে চেয়েছিল তারা।প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—এ কাজ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক সহজ।তবে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া জরিপ প্রকাশের কথা স্বীকার করার আগেই সেসব তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের জরিপসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডারেও জায়গা পেয়েছিল এসব জরিপ।কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল ভুয়া জরিপজুন মাসে যাত্রা শুরু করা ওয়েজউড পোলস যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনি আসন নিয়ে জরিপ প্রকাশ করেছিল।

এসব জরিপ রাজনৈতিক প্রচারশিবির, ভাষ্যকার এবং বিভিন্ন জরিপ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের নজর কাড়ে।নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের জরিপ ট্র্যাকার বা তথ্যভাণ্ডারে ওয়েজউডের ১৫টি জরিপ তালিকাভুক্ত ছিল। পরে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।সংবাদমাধ্যমটি জানায়, জরিপগুলো তালিকাভুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী, গবেষণাপদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছিল।তবে ওয়েজউডের জরিপগুলো নিউইয়র্ক টাইমসের প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কিংবা কংগ্রেসের জাতীয় পর্যায়ের জরিপের গড় হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।তারপরও ঘটনাটি দেখিয়েছে, কাগজে-কলমে স্বচ্ছতার তথ্য থাকলেই কোনো জরিপের সত্যতা নিশ্চিত হয় না।জরিপের তথ্য যাচাই নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ফিফটি প্লাস ওয়ানের অনুসন্ধানে ওয়েজউডের তথ্য নিয়ে অসংগতি ধরা পড়ে।প্রতিষ্ঠানটির কাঁচা তথ্য এবং জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রযুক্তিগত পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়।

এরপরই সন্দেহ তৈরি হয় জরিপের সত্যতা নিয়ে।পরে ওয়েজউড স্বীকার করে, তাদের অধিকাংশ জরিপের তথ্যই তৈরি করা হয়েছিল। যদিও প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন কয়েকজন জরিপ বিশ্লেষক। ফিফটি প্লাস ওয়ানের অনুসন্ধানে যুক্ত তথ্য সাংবাদিক জি এলিয়ট মরিস অভিযোগ করেন, সামাজিক পরীক্ষা চালানোর দাবি তুলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতারণা আড়াল করার চেষ্টা করছে।এটি ২০২৬ সালের নির্বাচনি চক্রে ভুয়া জরিপ নিয়ে দ্বিতীয় বড় ঘটনা। এর আগে আগস্টে মিডিয়ান স্ট্র্যাটেজিস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও পরীক্ষামূলক সামাজিক উদ্যোগের কথা বলে ভুয়া জরিপ প্রকাশের বিষয়টি স্বীকার করেছিল।ভুয়া জরিপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নির্বাচনি প্রচারভুয়া জনমত জরিপের প্রভাব শুধু জরিপশিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, অর্থায়ন এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে।এর একটি উদাহরণ মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ম্যালোরি ম্যাকমরোর ঘটনা।তিনি নির্বাচনে হেরে যান। তবে তার অভিযোগ, ওয়েজউডের একটি ভুয়া জরিপ তার নির্বাচনি প্রচারে বড় ক্ষতি করেছিল।ওই জরিপে তার জনসমর্থন এক অংকের ঘরে দেখানো হয়েছিল।

এতে প্রচারে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকেরা হতাশ হয়ে পড়েন।সাংবাদিকেরাও তাকে বারবার প্রশ্ন করতে থাকেন, নির্বাচনি লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত কি না।ম্যাকমমরোর দাবি, জরিপের নেতিবাচক ফল প্রকাশের পর তার প্রচারে অনুদানও কমে যায়। ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকেরা অন্য প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওয়েজউড এবং মিচেল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন্সের দুটি জরিপকে তার প্রচারের জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করেন।তার কথায়, জরিপ দুটি একের পর এক আঘাতের মতো কাজ করেছিল এবং তার নির্বাচনি প্রচারকে শেষ করে দিয়েছিল।জুলাই মাসে সিনেট নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। ম্যাকমরোর বক্তব্য, প্রচারের জন্য অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল, বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো কাজ করছিল। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি হয়ে গেছে।

ভুয়া জরিপ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়ছেযুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যান ইনফর্মড পাবলিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়েজউডের ভুয়া জরিপের বিষয়টি কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা বিশ্লেষণ করেছে।প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা দেখেছেন, শুরুতে এ নিয়ে আলোচনা মূলত জরিপ বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনি তথ্য নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

পরে বিষয়টি রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও দলীয় অবস্থানভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে।কিছু পোস্টে বলা হয়, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদমাধ্যম ও জরিপ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানও ভুয়া তথ্য প্রকাশ করেছে।আবার কেউ কেউ এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে সামগ্রিকভাবে জনমত জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভালো করার ইঙ্গিত দেওয়া জরিপগুলোকে অবিশ্বাস করার আহ্বান জানানো হয়।প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ঘটনা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচনা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, নিউইয়র্ক টাইমস ধরা পড়েছে। তার অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমটির বিভিন্ন তথ্যই কৃত্রিম।এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে করা ১৫ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলাও আরও শক্তিশালী হবে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।ভুয়া জরিপ ঠেকাতে কি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভবযুক্তরাষ্ট্রে ভুয়া জনমত জরিপ প্রকাশ করাকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।তবে কয়েকটি অধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞের মতে, ইচ্ছা করে ভুয়া জরিপ প্রকাশের ঘটনা প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করে ফেডারেল আইনে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে এ ধরনের জরিপ প্রচারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সংবাদ বিকৃত করা বা ভুয়া তথ্য সম্প্রচারের ক্ষেত্রে ফেডারেল সম্প্রচার লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।তবে এফসিসির একমাত্র ডেমোক্রেটিক কমিশনার আনা গোমেজ এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন।তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা জরিপকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যম প্রকাশ্যে পাওয়া জরিপের তথ্য সৎ উদ্দেশ্যে প্রকাশ করলে শুধু জরিপটি ভুল হওয়ার কারণে তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।