প্রশাসনকে ফের ডাইভারসিটি ভিসা বা ডিভি ভিসা চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন শুরুর তারিখ ঘোষণা না করায় কর্মসূচিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে সেই অনিশ্চয়তা কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই কর্মসূচিটির আওতায় ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কমসংখ্যক অভিবাসী পাঠায়- এমন দেশগুলোর নাগরিকরা স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিসা পাওয়ার সুযোগ পান।
গত ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক জিনসুক ওহতা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও পররাষ্ট্র দপ্তরকে ২০২৭ সালের ডিভি লটারির নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দেন।
তবে আদালতের নির্দেশের অর্থ এই নয় যে এরই মধ্যে আবেদন করা যাচ্ছে বা লটারিতে নির্বাচিত হলেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার নিশ্চয়তা মিলবে। নিবন্ধনের সময়সূচি, আবেদন যাচাই, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও প্রশাসনের সম্ভাব্য আপিলের বিষয়গুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নিবন্ধন শুরুর সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আদালতের নির্দেশ
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে বৃহস্পতিবারের (২৯ অক্টোবর) মধ্যে নিবন্ধনের বিস্তারিত তথ্য ঘোষণা করতে, ১ নভেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন শুরু করতে ও ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচিত আবেদনকারীদের জানাতে বলা হয়েছে। এগুলো আদালতের নির্দেশে নির্ধারিত সময়সীমা; বাস্তবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে এগোবে, তা প্রশাসনের পদক্ষেপ ও মামলার পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, ২০২৭ সালের ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচির নিবন্ধন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিবন্ধনের নতুন তারিখ পরে জানানো হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় তারিখ ঘোষণা না করায় কর্মসূচিটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এ অবস্থায় রেড ঈগল ল নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে নিবন্ধন শুরুর সময় ঘোষণা না করার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী কার্টিস মরিসনের যুক্তি ছিল, নিবন্ধন না খুললে আবেদনকারী পাওয়া যাবে না, লটারির মাধ্যমে কাউকে নির্বাচন করা যাবে না এবং ২০২৭ সালের কর্মসূচিও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে।
বিচারক ওহতা এ যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এতে নিবন্ধন শুরুর ঘোষণা, ৩০ দিনের নিবন্ধনপর্ব, নির্বাচিত ব্যক্তিদের অবহিত করা এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে লটারিতে নির্বাচিত হওয়া আর ভিসা হাতে পাওয়া এক বিষয় নয়। আবেদনকারীদের যাচাই ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব হলে নির্বাচিত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ভিসা ইস্যুর শেষ সময়সীমা ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। এ ছাড়া প্রশাসনের আপিল কিংবা আদালতের আদেশ স্থগিত হলে নির্ধারিত সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
আইনজীবী মরিসন বলেছেন, আগের বছরের মতো এবারও যেন কর্মসূচিটি বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, নিবন্ধন শুরুর নির্দেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি নির্বাচিতদের ভিসা প্রক্রিয়াও সময়মতো সম্পন্ন করা জরুরি।
১৯৯০ সালের আইনে চালু হয় ডিভি লটারি
যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি কর্মসূচির সূচনা ১৯৯০ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আইনটিতে স্বাক্ষর করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসনের ক্ষেত্রে যে ভারসাম্যহীনতা ছিল, তা কমানো ও তুলনামূলক কম অভিবাসী পাঠানো দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সাধারণত পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আত্মীয়স্বজন বা চাকরির সংযোগ রয়েছে, এমন ব্যক্তিরা সুবিধা পেতে পারেন। ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি সেই সংযোগ না থাকা ব্যক্তিদের জন্যও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরির পথ খুলে দেয়।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার অভিবাসী ভিসা দেওয়া হয়। তবে এই সংখ্যা মূল আবেদনকারীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা করে বরাদ্দ করা হয় না। স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদেরও নির্ধারিত ভিসা বরাদ্দের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে মূল আবেদনকারীর সংখ্যা মোট ভিসার সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
লটারিতে নির্বাচিত হলেই মিলবে না গ্রিন কার্ড
ডাইভারসিটি ভিসা লটারিতে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। সাধারণভাবে মূল আবেদনকারীর অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সমমানের শিক্ষা থাকতে হবে অথবা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এমন কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরির প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া ভিসা পাওয়ার জন্য প্রযোজ্য অভিবাসন আইন, নিরাপত্তা যাচাই ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। লটারিতে নির্বাচিত হওয়া কেবল ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগ তৈরি করে; এটি ভিসা পাওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিশ্চয়তা নয়।
সমালোচকদের একাংশের যুক্তি, অভিবাসনের সুযোগ এমন ব্যক্তিদের দেওয়া উচিত, যারা যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষতা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারবেন। তবে এই যুক্তির বিপরীতে বলা হচ্ছে, দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ রেখেও এমন ব্যক্তিদের জন্য সীমিত পথ খোলা রাখা সম্ভব, যাদের যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকে কোনো পারিবারিক বা পেশাগত সংযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯০ সালের অভিবাসন আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক কংগ্রেস সদস্য ব্রুস মরিসনের মতে, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অন্যতম উপায় হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিজেদের যোগ্যতায় এগিয়ে আসতে আগ্রহী মানুষদের আকৃষ্ট করা।
আদালতের নির্দেশের পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি
ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি চালুর বিষয়ে আদালতের নির্দেশের পেছনে মূল প্রশ্নটি হলো, কংগ্রেসের প্রণীত আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগ কতটা এড়িয়ে যেতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া চালু না করার ফলে কর্মসূচিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তবে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন আপিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আদেশের বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার আবেদনও করেছে সরকার। ২১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের তারিখ ও নিয়মাবলি প্রকাশিত হলে সেগুলো যাচাই করে আবেদন করা জরুরি। নিবন্ধন শুরুর আগেই অর্থ দাবি করে বা দ্রুত গ্রিন কার্ড পাইয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে কোনো বেসরকারি ওয়েবসাইট আবেদনকারীদের প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে। তাই সরকারি ঘোষণা ছাড়া কোনো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
আদালতের নির্দেশ ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগাতে নিবন্ধন চালু করা, আবেদন যাচাই ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন।