বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ফ্রান্স। একইসঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইউরোপের দেশটি। সেখানে ফরাসিদের যে সমস্যা, তার সঙ্গে অভাবনীয় মিল মার্কিনিদেরও। সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধও তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রও কি ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়তে পারে?
দুই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু মিল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণও বিশাল। বাজেট ঘাটতি ও ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। তবে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারের ওপর আস্থা এবং মার্কিন অর্থনীতির আকার দেশটিকে এখনো কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে ফ্রান্সের মতো সংকটের আশঙ্কা কম। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটির ঋণ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
ঋণের চাপে ফ্রান্স
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ।
অন্যদিকে, দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার যে পরিমাণ অর্থ আয় করছে, তার তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি।
ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ও সরকারি অর্থের ওপর চাপ তৈরি করছে।
সংকট মোকাবিলায় কর বাড়ানো কিংবা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠছে।
যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও ঋণের সুদ ও সরকারি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণও কম নয়
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রও স্বস্তিতে নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বার্ষিক জিডিপির কাছাকাছি।
সর্বশেষ হিসাব করা বাজেট ঘাটতি ছিল প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ছয় শতাংশের বেশি।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে। ফেডারেল সরকারের মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ চলে যাচ্ছে শুধু ঋণের সুদ মেটাতে।
অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রতি সাত ডলারের প্রায় এক ডলার ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
তারপরও ফ্রান্সের মতো সংকটের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রে এখনই তীব্র নয়। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুবিধার অন্যতম কারণ হলো মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে সম্পন্ন হয়। তেল ও সোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের লেনদেনেও ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা ডলারকে এখনো তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের প্রতিও তাদের চাহিদা রয়েছে। ফলে সরকার ঋণ নিতে পারছে তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে।
বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই মার্কিন সরকারি বন্ডের দিকে ঝোঁকেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ডলারের এই সুবিধা চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা নয়। সরকারের ঋণ ও সুদের ব্যয় বাড়তে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রবৃদ্ধির আশা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আরেকটি শক্তি হলো এর বড় আকার ও বৈচিত্র্য। দেশটির বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ফলে কোনো একটি খাতে মন্দা দেখা দিলেও অন্য খাতের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি করছে। প্রযুক্তি খাতে এই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতি দ্রুত বাড়লে সরকারি ঋণের তুলনায় জিডিপির আকারও বাড়ে। এতে ঋণের বোঝা সামলানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির মতে, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি অনেকটা কাছাকাছি। অন্যদিকে, এআই খাতের অবদান যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ সামলাতে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
তবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থাকলেই ঋণের সমস্যা দূর হয়ে যায় না। ঋণের সুদ ও সরকারি ব্যয় দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই রাখা জরুরি।
ফ্রান্সের সংকট কি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে?
ফ্রান্সের ঋণসংকট নিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও উদ্বেগ রয়েছে। একটি বড় অর্থনীতিতে আর্থিক অস্থিরতা তৈরি হলে তা অন্য দেশের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, আপাতত ফ্রান্সের সংকট অন্য ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সীমিত।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে সদস্যদেশগুলোর সরকারি বন্ড কেনার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে বাজারের অস্থিরতা কমাতে এই ব্যবস্থা কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ ছাড়া ইউরোপের কয়েকটি দেশের বাজেট ঘাটতি ফ্রান্সের তুলনায় কম। কোনো কোনো দেশ চলতি বছর বাজেট উদ্বৃত্তও অর্জন করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বিষয়ে সমর্থন রয়েছে। ফলে দেশটির ঋণসংকটের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও এখন প্রধান উদ্বেগ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ঋণসীমা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো সরকারি ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ।
দেশটির সরকার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ঋণসীমায় পৌঁছালে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া নতুন করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ঋণসীমা বাড়াতে কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।
এ নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে সরকার তার কিছু আর্থিক দায় সময়মতো পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়তে পারে। এমনকি ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মার্ক জান্ডি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী বছর ঋণসীমা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা সম্ভব। তবে এটি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
ঋণসীমা বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের পথে যাবে?
ফ্রান্সের সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দুই দেশের সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি ও সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের মিল রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই ফ্রান্সের মতো আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। কিন্তু এই সুবিধাকে দায়িত্বশীল আর্থিক নীতির বিকল্প ভাবার সুযোগও নেই।
সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় টেকসই পর্যায়ে রাখা না গেলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।