ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে অভিশংসনের পর গ্রেপ্তার প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

একটি ডিজিটাল ব্যাংকের পতনের জেরে অভিশংসিত হয়েছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট ৪৫ বছর বয়সী সান্তিয়াগো পেনা। ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় সঞ্চয় ও পেনশনের অর্থ তুলতে পারছেন না প্রায় ৩০ লাখ আমানতকারী। সেই ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ারের মালিকা ছিলেন প্রেসিডেন্ট পেনা।

সপ্তাহের শুরুতে উয়েনো ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাংকটির সঙ্গে পেনার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসতেই তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গতকাল শুক্রবার তাঁর নিজ দলসহ দেশটির আইনপ্রণেতারা তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার নিজেই পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন পেনা। কিন্তু তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সিনেটররা অভিশংসনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন। তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাধারণত যে আইনি দায়মুক্তি পাওয়ার কথা, সেটিও হারালেন তিনি।

কেন অভিশংসিত হলেন পেনা?

গত বছর পর্যন্ত উয়েনো ব্যাংকের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছিল পেনার। ব্যাংকটির পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকিতে হস্তক্ষেপ, পেনশন তহবিল আত্মসাৎ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা রক্ষায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

৪৫ সদস্যের সিনেটে ৪৪ জনের সমর্থনে অভিশংসন প্রস্তাবটি পাস হয়। ভোটাভুটিতে একজন আইনপ্রণেতা অনুপস্থিত ছিলেন। পরে সিনেটের সভাপতি বাসিলিও নুনেজ (বিবিসিকে) জানান, পেনা কর্তব্যে অবহেলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ব্যাংক ধসের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। ডিজিটাল ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি অধিগ্রহণ করে। এতে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ তাঁদের আমানত নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

প্রায় ৩০ লাখ আমানতকারী তাঁদের সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা তুলতে পারছেন না। এ নিয়ে রাজধানী আসুনসিওনসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ। নিজেদের জমানো অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।

পেনার অপসারণের পর প্যারাগুয়ের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ২০২৮ সাল পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পরই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। আলিয়ানা বলেন, ‘ব্যাংকটির আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে যেসব নাগরিক দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তাঁদের পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’

এদিকে সিনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা ঘটনাটিকে প্যারাগুয়ের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারি বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এটি রাষ্ট্র, সাধারণ মানুষ এবং দেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত পড়েছে।

প্রেসিডেন্টের পদ হারানোর পর এবার আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন পেনা। ব্যাংকটির পতনের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা। বিশ্বাসভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আজ শনিবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সিলভিয়া মার্গারিটা গঞ্জালেজ ভেস্টার।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন পেনার আইনজীবী রিকার্দো প্রেদা। তাঁর ভাষায়, অভিযোগগুলো ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন, সুবিধাবাদী ও ভিত্তিহীন’।

এর আগে বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুঃখ প্রকাশ করেন পেনা। তিনি বলেন, ‘আপনারা আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন, তা ভঙ্গ করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।’

সব মিলিয়ে একটি ডিজিটাল ব্যাংকের পতন এখন প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় লাখো মানুষ। নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং আর্থিক খাতে মানুষের আস্থা আবারও ফিরিয়ে আনা।