গহনা ছাড়াও আর কী কী কাজে সোনা ব্যবহার হয়

সোনার গহনা মানেই মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্য, বিয়ে আর সংস্কৃতির কথা। তবে হাজার বছর ধরে অলঙ্কার ছাড়াও আরও অনেক কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে এই মহামূল্যবান ধাতু।

 

সোনার নানাবিধ ব্যবহারের মূল কারণগুলো হলো এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। সোনার বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা এবং এটিকে অত্যন্ত পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিষ্টি, চকলেট, কেক, আইসক্রিম কিংবা বিশেষ খাবার সাজাতে অত্যন্ত পাতলা খাওয়ার উপযোগী সোনার পাত বা ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ ব্যবহার করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহৃত সোনা ‘ই১৭৫’ নামে একটি অনুমোদিত ফুড অ্যাডিটিভ। খাবারে ব্যবহারের সোনা সাধারণত খুব উচ্চমাত্রায় বিশুদ্ধ করা হয়, প্রায় ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট এবং অত্যন্ত পাতলা হয়। তবে খেলে যে শরীরের জন্য খুব উপকারী বা এতে বিশেষ কোনো পুষ্টিগুণ রয়েছে, তা নয়। কারণ, ধাতব সোনার দ্রাব্যতা খুব কম হওয়ায় মানুষের পরিপাকতন্ত্রে এটি শোষিত হয় না। খাবারে সোনা ব্যবহার করা হয় মূলত সাজসজ্জা ও বিলাসিতার জন্য, পুষ্টির জন্য নয়। দামি বা বিলাসবহুল হোটেল-রেস্তোঁরায় খাবার ও পানীয়কে আকর্ষণীয় করতে অতি পাতলা সোনার পাত, ছোট ছোট টুকরা, গুঁড়া বা ক্ষুদ্র পাপড়ির মতো করে এটি ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও মিষ্টি সাজাতে সোনা বা রুপার পাত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে, যাকে সাধারণভাবে ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ বলা হয়।

 

খাবারে সোনা ব্যবহারের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে গবেষণাও হয়েছে বিভিন্ন সময়। ২০২৩ সালে ‘পার্টিকল অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর করা ৯০ দিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ‘ই১৭৫’ খাওয়ানোর পর তাদের লিভার, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি পাওয়া যায়নি। তবে অন্ত্রে থাকা জীবাণুর পরিমাণ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। যেমন, মানুষ সাধারণত যতটা সোনা খায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে সোনা খাওয়ানো স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে হালকা প্রদাহ দেখা গেছে।স্মার্টফোনের ভেতরেও সোনা থাকে, যদিও পরিমাণে খুবই সামান্য। পাশাপাশি, কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট বোর্ড, কানেক্টর, সুইচ ও অন্যান্য সংযোগস্থলেও সোনা ব্যবহার করা হয়। এর কারণ, সোনার মধ্য দিয়ে সহজেই বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে এবং সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। ফলে বৈদ্যুতিক সংযোগ দীর্ঘদিন সচল রাখতে এটি বেশ কার্যকর হয়। একটি যন্ত্রে খুব অল্প সোনা থাকলেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি হয়। ফলে সব মিলিয়ে এই খাতে সোনার ব্যবহারও কম নয়। সে কারণেই পুরোনো ফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে সোনা সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারেরও প্রচলন রয়েছে।

 

মহাকাশেও প্রয়োজন সোনার

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও নানা কাজে সোনা ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা বলছে, সোনা আলো ও তাপ বিকিরণ খুব ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। আবার সহজে এর উজ্জ্বলতাও নষ্ট হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নাগুলোতে সোনার খুব পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে সোনা বেশ কার্যকর। এই ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করেই জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের নক্ষত্র, ছায়াপথসহ দূরবর্তী বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করে। মহাকাশচারীদের হেলমেটেও সোনা ব্যবহার করা হয়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, হেলমেটের সামনে চোখ-মুখ ঢেকে রাখা স্বচ্ছ অংশে সোনার পাতলা প্রলেপ থাকে। এটি অনেকটা সানগ্লাসের মতো, যা সূর্যের তীব্র ও ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগেও সোনা ব্যবহার করা হয়।

 

রোগ শনাক্ত থেকে চিকিৎসায় সোনার ব্যবহার

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সোনার কিছু যৌগ, যা ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত, একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে আরও কার্যকর ওষুধ চলে আসায় এ ক্ষেত্রে সোনার ব্যবহার কমেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে আবার নতুনভাবে সোনার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতি ক্ষুদ্র ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে রোগ শনাক্ত করা, শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ের কিছু পরীক্ষাতেও সোনার ন্যানোপার্টিকল ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে কিছু দ্রুত পরীক্ষার কিটে ফলাফল বোঝাতে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, তা তৈরিতে এই কণা কাজে লাগে।