যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিকল্প খুঁজছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। তবে আইজেনকট ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে গাজাবাসীর। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিস শহরের বাসিন্দারা ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ পরবর্তী সরকার গঠন করবেন। তবে ইসরায়েলি রাজনীতিকদের গাজা-নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করছেন না অনেকেই। তাঁদের কাছে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট তুলনামূলক কম খারাপ বিকল্প।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় নিয়মিত ইসরায়েলি বিমান হামলা চলছে। এর মধ্যেই খান ইউনিসের বাসিন্দা আইমান আহমেদ বলেন, গাজার প্রতি ইসরায়েলি রাজনীতিকদের সবার নীতিই কঠোর। তবে তাঁদের মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্পটি বেছে নিতে চান তাঁরা। আহমেদ বলেন, ‘গাজার প্রতি তাদের সবার নীতিই কঠোর, তবে আমরা দুই শয়তানের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম শয়তানকেই বেছে নিচ্ছি।’
তিনি আশা করছেন, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট নির্বাচনে জয়ী হবেন। একই সঙ্গে তিনি গাজার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত রোডম্যাপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট একটি নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও গাজার পুনর্গঠনকাজ শুরুর শর্তও রয়েছে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। নেতানিয়াহু এতে সম্মতি দিলেও প্রাথমিক ধাপের বাইরে এগোননি। ওই ধাপে সীমিত পরিসরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের হাতে আটক শেষ জীবিত ও মৃত জিম্মিদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। প্রায় এক বছর ধরে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।
আইজেনকট জিতলেও পরিবর্তনের আশা কম
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের কাছের ধ্বংসস্তূপে ভরা সড়কে মোহাম্মদ আবেদ বলেন, নেতানিয়াহু জয়ী হলে সেটিকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির বিজয় হিসেবে দেখা হবে। তবে ক্ষমতায় যিনিই আসুন না কেন, গাজার পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না।
ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট দেশটির শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে। ফলে তাঁর নেতৃত্বে গাজার পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। আবেদ বলেন, ‘আইজেনকট জয়ী হলেও পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন হবে না, কারণ তাদের নীতিগুলো প্রায় একই রকম। শেষ পর্যন্ত সবকিছু একই থাকবে।’
ইসরায়েলে নির্বাচনে আরব দলগুলো পাচ্ছে ১৯ আসন, নেতানিয়াহু ও বিরোধীরা পাচ্ছে কত
‘আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই’
উত্তর গাজার বেইত হানুনে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাসান আল-মাসরি আশা করছেন, ইসরায়েলের নির্বাচন গাজার মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, এই নির্বাচন যেন আমাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। আমাদের সবকিছু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে; আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তারা আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছে, আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করেছে, আর আমাদের যা কিছু ছিল, সবই হারিয়ে গেছে।’
গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের অধিকাংশই এখনো বাস্তুচ্যুত। তাঁদের অনেকে বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজেদের বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপে কিংবা মানবেতর পরিবেশে গড়ে ওঠা তাঁবুর শিবিরে বসবাস করছেন।
ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারে গাজার ভবিষ্যৎ খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলা একমাত্র প্রধান প্রার্থী ছিলেন ছোট রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটসের প্রধান ইয়াইর গোলান। গাজার ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে সেখানকার মানুষ আশাবাদী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইমান আহমেদ বলেন, ‘গাজার বাইরের মানুষই শুধু এসব বিষয় নিয়ে ভাবে।’ তাঁর মতে, গাজার মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিদিন খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা।
তবে নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় এলে গাজায় আরও যুদ্ধ ও দুর্ভোগ নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যেকোনো প্রচেষ্টাকেই আমরা সমর্থন করি।’