বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে কিছু লেখকের অবদান তাদের জীবদ্দশায় যেমন যথাযথভাবে আলোচিত হয় না, তেমনি মৃত্যুর পরও তাদের সাহিত্যকর্মের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন অধরাই থেকে যায়। তেমনই একজন কথাসাহিত্যিক মকবুলা মঞ্জুর।
তার রচনাবৈচিত্র্য, বিষয়গত ব্যাপ্তি ও দীর্ঘ সাহিত্যিক অভিযাত্রা নতুন করে পাঠ ও মূল্যায়নের দাবি রাখে। উপন্যাস, ছোটগল্প, কিশোর উপন্যাস, শিশুতোষ সাহিত্য, অনুবাদ, জীবনী ও অন্যান্য গদ্যরচনায় তার সৃজনশীল উপস্থিতি প্রমাণ করে, সাহিত্যকে তিনি কোনো একটি বিষয় কিংবা নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।মানুষের জীবন, সমাজের পরিবর্তন, ইতিহাসের অভিঘাত, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, নারীর অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে তিনি তার সাহিত্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত এই লেখকের সৃজনশীলতার বিস্তার আড়ালেই রয়ে গেছে।
আত্মপ্রচারবিমুখ এই মানুষ সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন, সম্মুখে এনেছেন তার সাহিত্যসম্ভার। তার সমগ্র রচনাসম্ভারের দিকে তাকালে এমন একজন লেখকের পরিচয় পাওয়া যায়, যিনি নিজের সময়কে অনুধাবন করেছেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সমাজের পরিবর্তন সাহিত্যে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।
মকবুলা মঞ্জুরের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার মুগবেলাই গ্রামে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার অনুকূল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই লেখকের সাহিত্যপ্রতিভার বিকাশ ঘটে শৈশবেই। মাত্র আট বছর বয়সে তার ছড়া দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি কথাসাহিত্যে আত্মনিয়োগ করেন।নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন উপন্যাস, গল্প ও অন্যান্য গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে। শিক্ষাজীবন, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা এবং সম্পাদনার অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যিক মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষত সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ফিচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং দৈনিক আজাদ পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাকে সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি, নারীজীবন ও মানুষের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ করে দেয়।
২০২০ সালের ৩ জুলাই তার জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু একজন লেখকের মৃত্যু তার সাহিত্যিক যাত্রার শেষ কথা নয়; বরং পরবর্তী প্রজন্মের পাঠ, অনুসন্ধান ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই তার রচনার প্রকৃত তাৎপর্য ক্রমে উন্মোচিত হয়।
মকবুলা মঞ্জুরের সাহিত্যিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তার উপন্যাস। ‘আর এক জীবন’ (১৯৬৮), ‘অবসন্ন গান’ (১৯৮২), ‘বৈশাখে শীর্ণ নদী’ (১৯৮৩), ‘জল রং ছবি’ (১৯৮৪), ‘আত্মজ ও আমরা’ (১৯৮৮), ‘পতিত পৃথিবী’ (১৯৮৯), ‘প্রেম এক সোনালী নদী’ (১৯৮৯), ‘শিয়রে নিয়ত সূর্য’ (১৯৮৯), ‘অচেনা নক্ষত্র’ (১৯৯০), ‘কনে দেখা আলো’ (১৯৯১), ‘নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস’ (১৯৯২), ‘নদীতে অন্ধকার’ (১৯৯৬), ‘লীলা কমল’ (১৯৯৬) ও ‘কালের মন্দিরা’ (১৯৯৭) তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের তালিকায় স্থান পেয়েছে।