৩২ বছরের কর্মজীবনের অবসান, ফুলেল ভালোবাসায় সিক্ত অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদ

 

এ কে আজাদ স্টাফ রিপোর্টার:

দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবসরে গেলেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদ। দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মাননায় সিক্ত হয়ে বিদায় নিলেন তিনি। ফুলেল শুভেচ্ছা, নানা উপহারসামগ্রী এবং ফুল দিয়ে সুসজ্জিত লাল রঙের একটি হুন্দাই প্রাইভেট কারে তাঁকে বিদায় জানানো হয়। বর্ণাঢ্য ও ব্যতিক্রমী এ আয়োজন পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গণে এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সিলেট অঞ্চলের উপপরিচালক ড: মোহাম্মদ আব্দুল কাদির। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আতাউর রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুব আলম ও সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয় ও মাদ্রাসার প্রধান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সুপার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য দেন। বক্তারা অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে তাঁর সততা, নিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বক্তারা বলেন, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিম জাফলং উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তাঁর আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে সবার কাছে একজন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চাকরি থেকে অবসর নিলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান এই বিদ্যাপীঠের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্রধান অতিথি ড: মোহাম্মদ আব্দুল কাদির তাঁর বক্তব্যে বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার মহান ব্রত। একজন আদর্শ শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করেন। অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদ দীর্ঘ ৩২ বছর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সহকর্মীদের শ্রদ্ধাই একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

বিশেষ অতিথি ও অন্যান্য বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সার্থকতা তাঁর পদ-পদবি কিংবা চাকরির মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর অবস্থানই তাঁর জীবনের প্রকৃত অর্জন। অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদ দীর্ঘ কর্মজীবনে যে ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করেছেন, আজকের এই সংবর্ধনা তারই প্রতিফলন। বক্তারা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুন্দর অবসরজীবন কামনা করেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন প্রজন্মের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। ১৯৯৬ সালের এসএসসি ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জানান। এ সময় তাঁকে ক্রেস্ট, স্মরণিকা, হাতপাখা, শার্ট, প্যান্টসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রদান করা হয়।

প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আবেগাপ্লুত বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, ‘স্যার, আপনি কর্মজীবন থেকে বিদায় নিলেও আমাদের হৃদয় থেকে কখনো বিদায় নেবেন না। আপনার শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসা আমাদের জীবনের পথচলায় চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আপনি হয়তো আর নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসবেন না, কিন্তু এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আপনার সহযোগিতা, পরামর্শ ও ভালোবাসা অব্যাহত থাকবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সংবর্ধিত অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদ বলেন, দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও স্মরণীয় অধ্যায়। এই দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর ভালোবাসা এবং সহযোগিতা পেয়েছি। শিক্ষকতা আমার কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না; এটি ছিল আমার জীবনের সাধনা, দায়িত্ব ও ভালোবাসার জায়গা।

তিনি আরও বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জেনে-না জেনে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার কোনো কাজ কিংবা পরামর্শে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়ে থাকলে সেটিই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আজকের এই আয়োজন আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে। বিভিন্ন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের এমন ভালোবাসা, সহকর্মীদের সম্মান এবং এলাকাবাসীর আন্তরিকতা আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। চাকরি থেকে অবসর নিলেও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক কখনো শেষ হবে না। যত দিন বেঁচে থাকব, এই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ ও শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করব। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো প্রয়োজনে আমার সাধ্যমতো সহযোগিতা ও পরামর্শ অব্যাহত রাখব।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদকে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত একটি লাল রঙের হুন্দাই প্রাইভেট কারে বিদায় জানানো হয়। গাড়িটি ফুল ও বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়। প্রিয় শিক্ষকের এমন ব্যতিক্রমী বিদায়ের দৃশ্য উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও অতিথিদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তিতে এমন সম্মান ও ভালোবাসা পেয়ে আবেগাপ্লুত হন সংবর্ধিত অধ্যক্ষ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক কাজী সিরাজ উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ।

দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে এবং পশ্চিম জাফলংয়ের মানুষের ভালোবাসায় অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদের কর্মময় জীবন দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।