লন্ডনে ফ্ল্যাট না কিনে কম দামে নির্জন দ্বীপ কিনেছিলেন বেয়ার গ্রিলস

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রী বেয়ার গ্রিলস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে স্ত্রী শারা গ্রিলসকে সঙ্গে নিয়ে কিনে ফেলেন ওয়েলসের উপকূলের ২০ একরের একটি নির্জন দ্বীপ। সঙ্গে কেনেন টেমস নদীতে থাকা একটি হাউসবোটও। ২০০১ সালে কেনা এই দুটি সম্পত্তির মোট দাম পড়েছিল লন্ডনে যে দামে অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে চেয়েছিলেন, তারচেয়ে কম।

যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের লিন উপদ্বীপের কাছে অ্যাবারসোচ উপকূল থেকে কিছু দূরে অবস্থিত দ্বীপটির নাম সেন্ট টুডওয়ালস আইল্যান্ড ওয়েস্ট। প্রায় ২০ একর আয়তনের দ্বীপটিতে রয়েছে ২০০ বছরের পুরোনো একটি বাতিঘর ও বাতিঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের ব্যবহৃত দুটি কটেজ। সমুদ্রঘেরা নির্জন পরিবেশ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেও কেনার সময় সম্পত্তিটির অবস্থা ছিল বেশ শোচনীয়।

বেয়ার গ্রিলস ও তাঁর স্ত্রী দ্বীপটি কিনেছিলেন প্রায় ৯৫ হাজার পাউন্ডে। অন্যদিকে টেমসের হাউসবোটটির দাম ছিল প্রায় এক লাখ পাউন্ড। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল তিন লাখ ডলারের কম। ২০২১ সালে দ্য সানডে টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিলস বলেছিলেন, ২০০১ সালে তাঁরা ২ লাখ ৮৮ হাজার ডলারে লন্ডনের একটি ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু হাউসবোট ও দ্বীপটি একসঙ্গে তারচেয়ে কম দামে পেয়ে তাঁরা প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে এক অসাধারণ অভিযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন।

দ্বীপে গিয়ে অবশ্য স্বপ্নের বাড়ি পাননি তাঁরা। কটেজ দুটির ছাদ ছিল না ঠিকমতো, ছিল না বিদ্যুৎ কিংবা পানির ব্যবস্থা। চারদিকে ভাঙা ইট-পাথর ও ইঁদুরের উপদ্রব। বছরের পর বছর সংস্কারকাজ চালিয়ে দুটি কটেজকে একত্র করে চার শয়নকক্ষের একটি পারিবারিক আবাসে পরিণত করেন তাঁরা।

পুরোনো চুনাপাথরের প্রায় দুই ফুট পুরু দেয়াল বাড়িটিকে গ্রীষ্মে ঠান্ডা ও শীতে উষ্ণ রাখে। তবে ঝড়ের সময় দ্বীপে বসবাসের কঠিন বাস্তবতাও টের পাওয়া যায়। ২০১২ সালে ভ্যানিটি ফেয়ারকে গ্রিলস বলেছিলেন, প্রবল বাতাসে বাড়িটি কেঁপে ওঠে, এমনকি প্রায় ১৫০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত বাড়ির জানালাতেও সমুদ্রের পানির ছিটা এসে লাগে।

তিন সন্তানকে নিয়ে দ্বীপটিকে পারিবারিক অবকাশকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন গ্রিলস দম্পতি। মাঝেমধ্যে বন্ধুরাও বেড়াতে যান। তবে আবহাওয়া খারাপ হলে দ্বীপে আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দ্বীপে যাতায়াতও সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন নৌকায় তীরে এসে প্রায় এক মাইল পথ হেঁটে বাজার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করতে হতো। একটি স্লিপওয়ে নির্মাণের অনুমতি পেতে গ্রিলসকে প্রায় ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বর্তমানে পুরোনো আরএনএলআই ডি-ক্লাস লাইফবোটে যাতায়াত করেন তাঁরা। মালপত্র পরিবহনে ব্যবহার করেন কোয়াড বাইক ও ট্রেলার।

বিদ্যুৎ ও পানির জন্যও দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়। ছোট একটি বায়ুকল থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আর বাড়ির ছাদে জমা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা হয় দৈনন্দিন কাজে।

২০০৮ সালে দ্য টেলিগ্রাফকে গ্রিলস বলেছিলেন, বছরের একটি সময় তিনি পরিবার নিয়ে এমন একটি দ্বীপে থাকেন, যেখানে মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নেই। ছোট বায়ুকল ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থাতেই তাঁদের জীবন চলে।

লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবনের পরিবর্তে প্রকৃতির কাছাকাছি এমন নির্জন দ্বীপে বসবাসের সিদ্ধান্ত তাই শুধু সম্পত্তি কেনা নয়, বরং ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনধারা বেছে নেওয়ার গল্প।