সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই নেতানিয়াহুর, ক্ষমতার চাবি আরব দলগুলোর হাতে!

এবারে ইসরায়েলের নির্বাচনে মূল লড়াইটা ছিল নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবে, নাকি তার বিরোধীরা নতুন সরকার গড়বে। কিন্তু ভোট গণনার প্রাথমিক হিসাব সেই লড়াইয়ে যোগ করেছে আরো অভাবনীয় সমীকরণ। রেকর্ড ভোট পাওয়ায় নতুন সরকার গঠনের প্রশ্নে কিংমেকারের ভূমিকায় উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে আরব দলগুলোকে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এ যাত্রায় এই দলগুলোর দখলেই থাকতে যাচ্ছে নতুন সরকার গঠনের চাবি।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। ইসরাইলের পার্লামেন্ট ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির- নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট, কেউই এককভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাতে পারেনি। হালনাগাদ কয়েকটি জরিপে দুই শিবিরের আসনসংখ্যা কমবেশি ৫০টি করে দেখানো হচ্ছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে দুই শিবিরের জন্যই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের খেলায় আরব দলগুলো এখন আর প্রান্তিক নয়। এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা কেবল একটি স্বল্পস্থায়ী নির্বাচনী সাফল্যই নয়, এটি ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণে তাদের সক্ষমতা বদলেরও ইঙ্গিত। আগের নেসেটে জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের সম্মিলিত আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ১০টি। এবার বুথফেরত জরিপের হিসেবে, সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হবে।

বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঐতিহাসিক এই উত্থানের পেছনে আছে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। চ্যানেল টুয়েলভের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ১৯৯৯ সালের পর যা সর্বোচ্চ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা, আরব সমাজে সহিংস অপরাধ দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং কট্টর ডানপন্থী ইসরায়েলি দলগুলোর প্রচারণার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরব ভোটারদের সক্রিয় করতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর জোটের জন্য এখানেই দেখা দিয়েছে এক গুরুতর রাজনৈতিক জটিলতা। তার মিত্রদের কেউ কেউ আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের আলোচনার বাইরে রাখার অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বলছে, রাজনৈতিকভাবে যাদের দূরে সরিয়ে রাখতে চাওয়া হচ্ছে, তাদের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পাল্লা ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এ অবস্থায় ইসরাইলি রাজনীতির কিংমেকার হয়ে উঠেছেন রাআম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাস। আব্বাসের রাজনৈতিক গুরুত্ব নতুন নয়। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তার দল ইসরায়েলের একটি ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অংশ হয়েছিল। আব্বাস জানিয়েছেন, সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে দুই প্রধান শিবিরের প্রতিনিধিরাই তার দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তিনি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।

আরেক আরব দল জয়েন্ট লিস্টের অবস্থানও ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। দলটি সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও বিকল্প সরকার গঠনের পক্ষে ভোট দেওয়া বা বিরত থাকার মাধ্যমে সংসদীয় হিসাব বদলে দিতে পারে। ফলে আরব দলগুলোর দর-কষাকষি শুধু মন্ত্রিত্ব পাওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা, বৈষম্য, আবাসন ও সরকারি বরাদ্দের মতো নানা কিছু নিয়ে শর্ত আলোচনায় আসতে পারে।

তবে আরব দলগুলো শেষমেশ সরকার গঠনে কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তাও রয়েছে। আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের কথা বললেও তার জোটে থাকা আভিগদর লাইবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু পার্টি এবং নাফতালি বেনেতের বি-ইয়াখাদ পার্টি আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠনে বিরোধিতা করে আসছে।

এই দ্বন্দ্বই আরব দলগুলোকে একই সঙ্গে শক্তিশালী ও অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছে। তাদের আসনসংখ্যা বাড়লে সরকার গঠনের আলোচনায় প্রভাব বাড়বে, কিন্তু সেই প্রভাব বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে অন্য দলগুলোর আপসের ইচ্ছার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, আরব দলগুলোকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার হিসাব মেলানো এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে।