“দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও সংস্কারের দাবিতে জনতার প্রতিবাদ; সরকারের ওপর চাপ বাড়লেও ক্ষমতার পরিবর্তন নির্ভর করে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নির্বাচনের ওপর”
আব্দুল খালিক:
দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, নারীর নিরাপত্তা কিংবা নির্বাচনী স্বচ্ছতা—বিভিন্ন ইস্যুতে বারবার রাজপথে নেমেছেন ভারতের সাধারণ মানুষ। কখনো শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, কখনো কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, আবার কখনো নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জনরোষ সরকার ও প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। এসব আন্দোলনের চাপে নীতিগত পরিবর্তন এসেছে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পদত্যাগ করতে হয়েছে, বদলেছে আইনও। কিন্তু এত প্রতিবাদ, এত জনসমাগম, এত স্লোগানের পরও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটানো যে সহজ নয়, তা দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় বারবার স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠেছে দিল্লির রাজপথ। আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, পুলিশের ধরপাকড় এবং বিরোধী দলগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তবু মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে- রাজপথের আন্দোলন সরকারকে চাপে ফেলতে পারলেও ক্ষমতার ভিত কেন সহজে নড়াতে পারে না?
ভারতের আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস
ভারতের আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আসাম আন্দোলন, বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, দুর্নীতিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন’ আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন- বিভিন্ন সময়ে এসব আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ কিংবা নারীর নিরাপত্তা নিয়ে জনরোষও রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ এবং আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আন্দোলন দেখিয়েছে, জনমতের চাপ উপেক্ষা করা সব সময় সহজ নয়।
তবে জনরোষ সৃষ্টি হওয়া আর সরকার পরিবর্তন—দুটি এক বিষয় নয়। রাজপথের আন্দোলন সরকারের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জোরালো করতে পারে, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের টিকে থাকার প্রশ্ন নির্ধারিত হয় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজপথে ব্যাপক বিক্ষোভ হলেই সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতা হারায় না। সরকারকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে হয়, অথবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হতে হয়।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্দোলনের প্রভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, তবে তার অনেক ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। জরুরি অবস্থার পর ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় এবং জনতা পার্টির ক্ষমতায় আসা তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অর্থাৎ, আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তনকে সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তরে রূপ দেয় নির্বাচনী রায় ও সংসদীয় প্রক্রিয়া। এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলেই বোঝা যায়, কেন বিশাল জনসমাবেশ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের পরও ক্ষমতাসীন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে যায় না।
কেন জাতীয় আন্দোলন সরকার পতনে রূপ নেয় না?
এর অন্যতম কারণ ভারতের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। দেশটির প্রতিটি রাজ্যের সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সমস্যা, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। একটি রাজ্যে যে ইস্যুতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে, অন্য রাজ্যে সেটি একই মাত্রায় সমর্থন নাও পেতে পারে। ফলে স্থানীয় ক্ষোভকে জাতীয় পর্যায়ে অভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতাও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার পথে বাধা হতে পারে।
এ ছাড়া আন্দোলনের ব্যাপ্তি আর নির্বাচনী সমর্থনের ব্যাপ্তি এক নয়। রাজপথে যাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তাঁরা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হন। কিন্তু নির্বাচনে ভোটারদের বিবেচনায় আসে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় উন্নয়ন, নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক স্বার্থসহ বহু বিষয়। তাই কোনো আন্দোলনে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ থাকলেও তা যে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ, আদালত, নির্বাচন কমিশন এবং সংসদীয় কাঠামো—সব মিলিয়ে আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি নির্ধারিত হয়। প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আন্দোলনের গতি কমাতে পারে; আদালতের হস্তক্ষেপ আন্দোলনের জন্য নতুন আইনি পথ খুলে দিতে পারে; আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয় আন্দোলনকে বৃহত্তর নির্বাচনী ইস্যুতে রূপ দিতে পারে। ফলে আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে শুধু জনসমাগমের ওপর নয়, বরং সংগঠন, নেতৃত্ব, জনসমর্থনের বিস্তার এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার সংযোগের ওপর।
রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সোমবার (১২ অক্টোবর) দিল্লিতে আন্দোলনের তৃতীয় দিনে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রতিবাদে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মৃত, স্থানান্তরিত ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সংশোধন করা হচ্ছে; যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁরা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
এদিন বিরোধী নেতারা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধ নাকচ করেন। তিনি জানান, অভিযোগগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে উত্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ, আন্দোলনের একটি অংশ এখন রাজপথের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও বিচারিক পথেও সমাধান খুঁজছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ যন্তর-মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য পুলিশের কাছে নতুন তারিখ চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারিখ না পেলে নিজেরাই নতুন কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানিয়েছেন দলের নেতা আশুতোষ রাঙ্কা। সোমবার পর্যন্ত নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি; তবে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণাও আসেনি। সোমবার এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
আন্দোলন, ধরপাকড় ও সরকারের অবস্থান
গত শনিবার থেকে দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা চলছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড, মেট্রোর কয়েকটি স্টেশন বন্ধ এবং চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আন্দোলনের প্রথম দিকে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর দুই সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়েছিল। রোববার তাঁদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করার পর এক বছর শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। আলোচিত কনটেন্ট নির্মাতা ধ্রুব রাঠিও মুক্তি পেয়েছেন। তবে এসব মুক্তির অর্থ আন্দোলনের দাবি মেনে নেওয়া নয়; বরং আন্দোলনের নেতৃত্ব আবারও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
সোমবারের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস-এর খবর অনুযায়ী, আগের দিনের কঠোর অবস্থানের পর দিল্লির কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক হয়েছে এবং ইন্টারনেটের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় দিল্লিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের ক্ষেত্রে আটক হওয়ার আশঙ্কা ছিল। রোববারের বিক্ষোভে কয়েক শ মানুষকে আটক করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্ট আটক ও বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে প্রশাসনের অবস্থানে একদিকে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ কিংবা আন্দোলনকারীদের মূল দাবি মেনে নেওয়ার কোনো নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ হলেও একে কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি দেখায়, আন্দোলনের চাপে প্রশাসনকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধরন পরিবর্তন করতে হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হতে পারে, এমনকি বিরোধীরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের কোনোটিই নিজে থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেড়ে নেয় না। সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায়।
তরুণদের অংশগ্রহণে নতুন মাত্রা
বর্তমান আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তরুণদের প্রতিবাদের নতুন পরিসর তৈরি করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনও সেই প্রবণতার একটি উদাহরণ। এর আগে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়মের প্রতিবাদে তরুণদের সক্রিয়তা সরকারকে চাপের মুখে ফেলেছিল। বর্তমান আন্দোলনেও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ সামনে এসেছে।
তবে আন্দোলনের স্থায়িত্ব শুধু জনসমাগম কিংবা অনলাইন আলোচনার ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন সুস্পষ্ট দাবি, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব, তথ্যভিত্তিক অবস্থান এবং সাংবিধানিক পদ্ধতিতে দাবি বাস্তবায়নের কৌশল। ক্ষোভকে সংগঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগে রূপ দিতে না পারলে অনেক সময় বড় আন্দোলনও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, আন্দোলনের দাবিগুলো যদি বৃহত্তর জনসমর্থন পায় এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়, তবে তার প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।
প্রতিবাদের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
আন্দোলন মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশকে আইনসম্মত ও সংযত আচরণ করতে হয়। বিক্ষোভকারীদের আটক, সমাবেশে বাধা কিংবা হামলার অভিযোগ উঠলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একইভাবে আন্দোলনকারীদেরও তথ্য যাচাই, অহিংস কর্মসূচি এবং অন্যের অধিকার রক্ষার বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হলেও নতুন প্রতিবাদস্থল নির্ধারণ এবং যন্তর-মন্তরে সমাবেশের অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নিরাপত্তা জোরদার করে নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দূর করা যায় না। প্রয়োজন অভিযোগের জবাব, তথ্য প্রকাশ, নিরপেক্ষ যাচাই এবং আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত সরকার টলবে কি?
বর্তমান আন্দোলন কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। ককরোচ জনতা পার্টি নতুন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে, বিরোধী জোট আদালতের পথ অনুসরণ করছে এবং প্রশাসন বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও বহাল রয়েছে। তবে সোমবার পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের মূল দাবি মেনে নেওয়া কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতি আবারও সেই মৌলিক সত্যটি সামনে আনে- ভারতে রাজপথের আন্দোলন সরকারকে চাপে ফেলতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ যতই বাড়ুক, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অটুট থাকলে সরকার সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকতে পারে। অন্যদিকে, আন্দোলন যদি নির্বাচনী জনমতকে প্রভাবিত করে, বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ বদলে যায়, তখনই ক্ষমতার পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনের দিনে ভোট দেওয়ার অধিকারে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থায়। আন্দোলনের ফলে সরকার পতন ঘটল কি না, সেটিই প্রতিবাদের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। কোনো আন্দোলন যদি অনিয়মের প্রশ্ন সামনে আনে, নীতিগত পরিবর্তনের পথ তৈরি করে কিংবা নাগরিক অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ায়, তবে তারও রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে।
ভারতের রাজপথে বারবার প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে, ভবিষ্যতেও উঠতে পারে। কিন্তু সেই ঢেউ কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে জনতার ক্ষোভকে কতটা সুসংগঠিত, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর। ক্ষমতাসীন সরকারের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন ক্ষমতায় থাকার সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে পারে, কিন্তু জনআস্থা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান। রাজপথের প্রতিবাদ আর ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যবর্তী দূরত্বটুকু নির্ধারণ করে শেষ পর্যন্ত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নির্বাচনী জনমত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা। ভারতের চলমান আন্দোলন তাই শুধু একটি পদত্যাগের দাবির প্রশ্ন নয়; এটি একই সঙ্গে পরীক্ষা করছে জনতার প্রতিবাদের শক্তি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোকে।
লেখক : ডেস্ক রিপোর্টার, দৈনিক সচিত্র সিলেট।