পায়রা বন্দরের চ্যানেল খনন: পলির নিচে ৬৫০০ কোটি টাকা
মোংলা ও পায়রা বন্দর। ছবি: সংগৃহীত
দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। এই বন্দরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোর এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙা করার আশা থাকলেও পলি জমে রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা কমে যাওয়ায় বিদেশি বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) আসতে পারছে না। সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করে চ্যানেলে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হলেও তিন বছর পরই তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা ১০ বছরে বন্দরটির আয়ের তিন গুণের বেশি। বর্তমানে চ্যানেলের গভীরতা বাড়াতে খননের জন্য ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অদূরদর্শী পরিকল্পনা, স্থানভিত্তিক অবকাঠামোগত সমন্বয়হীনতা এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা উপেক্ষার কারণেই পলিতে ঢাকা পড়ছে পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা। এ ছাড়া বন্দরের প্রথম টার্মিনালগামী সংযোগ সড়ক এবং আন্ধারমানিক নদীর ওপর সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি। আগের খননের সুফল বেশি দিন না পাওয়ার পর আবারও নতুন খনন প্রকল্পের টেকসই সুফল নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচে গড়ে তোলা এই বন্দর থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করতে বন্দরটি চালু করা জরুরি। তাই বন্দরটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট। রাবনাবাদ চ্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। পলি জমায় মারাত্মক নাব্যতা সংকটে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এই চ্যানেল। গত দুই বছরে বন্দরে এসেছে মাত্র দুটি কয়লাবাহী জাহাজ। সর্বশেষ জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে ৬ মাস আগে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকায় বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান জান ডি নুলকে দিয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল চ্যানেলের গভীরতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত করা, যাতে ৪০-৫০ হাজার মেট্রিক টন ক্ষমতার বড় জাহাজ ভিড়তে পারে। কিন্তু খননকাজ শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই উজান ও হিমালয় অঞ্চল থেকে বয়ে আসা বছরে প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার পলির চাপে চ্যানেলটি দ্রুত ভরাট হতে থাকে। পায়রা বন্দরের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের চার্ট বিশ্লেষণে কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে চ্যানেলের বর্তমান গড় গভীরতা নেমে এসেছে মাত্র ৫.৪ থেকে ৫.৯ মিটারে। অবস্থানভেদে ও জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ ড্রাফট (গভীরতা) পাওয়া যাচ্ছে ৬.৫ মিটার।
অথচ ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরুর আগেই রাবনাবাদ চ্যানেলের স্বাভাবিক গভীরতা ছিল ৫.৬ মিটার। স্থানীয় জেলেদের দাবি, প্রাকৃতিক উপায়ে এই চ্যানেলে সাধারণ সময়ে ৭-৮ মিটার এবং বর্ষায় ১০ মিটারের বেশি নাব্যতা থাকত। ফলে টার্মিনাল ও সড়ক তৈরি হওয়ার আগেই পাঁচ বছর আগের ড্রেজিং প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় লোকজন এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিং না করে ওই টাকায় নিজস্ব ড্রেজার সংগ্রহ করে নিয়মিত মেইনটেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ) খনন চালু রাখলে চ্যানেলকে বছরজুড়ে স্বাভাবিক ও ব্যবহারযোগ্য রাখা সম্ভব হতো।
বাংলাদেশ নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, রামনাবাদ চ্যানেল সমুদ্রের ভেতরে। সাইক্লোন হলে এটা বালুতে ভরে যায়। ২০০৯ সালে পায়রা বন্দর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল সম্পূর্ণ ভুল। এটি একটি ভুল বন্দর, ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল লোকেশন। এটাতে নতুন প্রকল্প নেওয়া ঠিক হবে না।
সূত্র জানায়, বন্দর কার্যকর করতে চ্যানেলে ১২ লাখ ঘনমিটার পলি মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করে নাব্য ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ড্রেজিং প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
কলাপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র হাজী হুমায়ুন শিকদার বলেন, ‘পায়রা বন্দর ঘিরে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম একটি অর্থনীতিক জোন তৈরি হয়েছে। তবে নাব্যতা সংকটের কারণে তা এখন বিঘ্নিত। বন্দরের আগের ড্রেজিং প্রকল্পটি ছিল মেগা দুর্নীতির। ৭০০-৮০০ কোটি টাকা খরচে নিয়মিত ড্রেজিং করলে চ্যানেলটিকে বছরজুড়ে স্বাভাবিক ও ব্যবহারযোগ্য রাখা সম্ভব হতো। আমাদের মতে, এত বেশি খরচ না করে নিয়মিত ড্রেজিং করলে বন্দর বছরে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে।’
আয়-ব্যয়ের বিশাল ব্যবধান
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চালু হওয়ার পর ১০ বছরে বন্দরটি থেকে সর্বমোট কাস্টমস ও বন্দর মাশুল বাবদ ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। এর মধ্যে বন্দরের মূল রাজস্ব আয় মাত্র ২৯৮ দশমিক ৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে আয়ের তিন গুণের বেশি অর্থ খরচ হয়েছে কেবল খনন খাতে। সূত্র বলছে, বিসিপিসিএল ও আরএনপিএল-এর কাছে ড্রেজিং লেভি বাবদ ৭১৩ কোটি টাকা পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বন্দরে বিদেশি বড় জাহাজ আসে ১১১টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আসে ১২৩টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আসে ৮৫টি। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৯টি বিদেশি জাহাজ এসেছে। অভ্যন্তরীণ বা লাইটার জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৩৩টিতে। দুই বছর পর সম্প্রতি পায়রা বন্দরের যন্ত্রপাতি নিয়ে ৪.৫ মিটার গভীরতার একটি জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভেড়ে।
পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আরএনপিএল-এর মূল চালিকাশক্তি আমদানি করা কয়লা। কিন্তু রাবনাবাদের প্রকৃত গভীরতা ভাটার সময় ৬ মিটারের নিচে নামায় কয়লাবাহী বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, কয়লা নিয়ে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) জেটিতে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ নোঙর করে মাদার ভেসেল এমভি সিনো ওশেন। এরপর চলতি বছরের ১২ মার্চ বহির্নোঙরে এসেছিল এমভি থেরেসা গ্রেস। গভীরতা না থাকায় ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা কয়লাবাহী বড় জাহাজগুলো বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড়ছে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেডে কয়লা খালাস করে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনা হচ্ছে। বাড়তি পরিবহনের কারণে প্রতি টন কয়লায় খরচ বাড়ছে প্রায় ৩ থেকে ৫ মার্কিন ডলার। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে।
বিসিপিসিলের প্ল্যান্ট ম্যানেজার শাহ আব্দুল হাসিব বলেন, পায়রা বন্দরে কয়লাবাহী মাদার ভেসেল না আসায় চট্টগ্রাম থেকে লাইটার জাহাজে ৪০০ কিলোমিটার পরিবহন করতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি খরচের প্রভাবে দাম বাড়ছে। নতুন ড্রেজিং প্রকল্প সম্ভবত এখনো পাস হয়নি। ড্রেজিং শুধু বিসিপিসিলের জন্য নয়, যে ইপিজেড হচ্ছে তার পণ্য খালাসের জন্যও দরকার। বিসিপিসিএল ও আরএনপিএলের কাছে ড্রেজিং লেভি বাবদ পায়রা বন্দরের প্রায় ৭১৩ কোটি টাকা বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বন্দরের সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। লেভি বাবদ বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন না। তিনি মূলত অপারেশন দিকটা দেখেন।
বিশেষজ্ঞরা চ্যানেল স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্পের সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, চ্যানেলের প্রাকৃতিক পলি জমার হার ও স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণের কৌশল নির্ধারণ না করে আবার এই বিপুল ব্যয়ও আগের মতো পলিতে চাপা পড়তে পারে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাবনাবাদ চ্যানেলে খননে আগের বিনিয়োগের ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতার কারণ নির্ণয় না করে নতুন বিনিয়োগ করা হলে সেটি উন্নয়নের চেয়ে পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের ঝুঁকি বেশি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি সমন্বিত জ্বালানি-পরিবহন ব্যয় পর্যালোচনা, টেকসই ড্রেজিং ও পলি ব্যবস্থাপনা, পূর্ণাঙ্গ সংযোগ অবকাঠামো এবং কয়লা পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা দরকার। উন্নয়নের সাফল্য শুধু ব্যয়ের পরিমাণে নয়; সেই ব্যয় উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়িয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা কমিয়েছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করেছে, তার ওপর নির্ভর করে।
নতুন খনন প্রকল্পের বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া বলেন, প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন হয়নি। পায়রা বন্দর চালু করতে হলে নদীর নাব্যতা রক্ষা করতে হবে। এমনিতেও এই বন্দরে কয়লার জাহাজ আসে। জাহাজ চলাচল বেশি হলে পলির পরিমাণ কমে যায়। আগামী জানুয়ারিতে বন্দর পুরোদমে কাজ শুরু করবে। জাহাজ চলাচল শুরু হলে খনন প্রয়োজন হবে না। আগের প্রকল্প সফল না হওয়ায় কোনো তদন্ত হয়েছে কি না–এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কী হয়েছে সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। জোয়ারের সময় ৫ থেকে ৬ মিটার পানি থাকে। এখন প্রকল্পে ৮ থেকে ৯ মিটার নিতে চাচ্ছি।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম বলেন, রাবনাবাদ চ্যানেলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই অবগত। এ কারণে চ্যানেলের নাব্যতা নিয়মিত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।