বিরোধী দল কমিটিতে না এলেও বিতর্কের সুযোগ থাকবে: সালাহউদ্দিন আহমদ

সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দল অংশ না নিলে বিতর্ক হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিতর্ক তৈরি হবে কি না, জানি না; তবে বিতর্ক করার একটা সুযোগ থাকবে। আমরা সব সময় আহ্বান জানাব, বিরোধী দল যেন আমাদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের মতামত দেয়।’

মঙ্গলবার ( ১৩ অক্টোবর ) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে শিক্ষাবিদদের মতবিনিময় শেষে এ কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রতিবেদন প্রণয়নের পর সংবিধান সংশোধনের বিল যখন সংসদে আসবে, তখন তারা অংশগ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করি। তারা যদি তাদের ভূমিকাটা সঠিকভাবে পালন না করে, সেটা জাতি দেখবে। তবে আমরা আমাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব, ইনশা আল্লাহ।’

কমিটির সভাপতি বলেন, আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ ছিল। তাঁরা (শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক) সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী কী বিষয় প্রতিফলিত হওয়া দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন—এমন বিষয় নিয়েও তাঁরা মতামত দিয়েছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান বিধান, ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত বিধান নিয়েও মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা ও মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত বিষয়ে বিচার বিভাগের এখতিয়ার কী হবে, তা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকেরা।

কমিটির সভাপতি আরও বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর খবরদারি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে তার এখতিয়ারও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত না হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে অনেকে লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে বৈঠকে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় ঐকমত্য হয়েছিল বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি আরও বলেন, আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে।

সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না—এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ। এ ব্যবস্থার মধ্যে উচ্চকক্ষের মতো কাঠামোয় কীভাবে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচকেরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। এসব মতামত লিখিত আকারেও পাওয়া যাবে। পরে সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাবও এসেছে।

সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন হয়েছে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করে। ওই কমিশনের সহসভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা তো সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছি। বিরোধী দলের নেতাদের কমিটিতে নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। তাঁরা এখনো নাম দেননি। যখনই দেবেন, তাঁদের স্বাগত জানানো হবে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, কমিটির প্রতিটি বৈঠকে ও জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলসহ সবাই মিলে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে চায় সরকার।

কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। আমরা চাই, তাঁরা আলোচনায় আসুক। তবে বিরোধী দল না এলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। এটা জাতির প্রত্যাশা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা আমাদের অঙ্গীকার।’

বিরোধী দল লিখিত মতামত দিতে পারে জানিয়ে সালাহউদ্দিন জানান, কমিটির প্রতিবেদন প্রণয়নের পর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে তাঁরা আশা করেন। জুলাই জাতীয় সনদে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ও সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নিতে হবে।

২৪ অক্টোবর (শনিবার) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, সংক্ষিপ্ত সময়ে তাঁদের বক্তব্য পুরোপুরি শোনা ও রেকর্ড করা কঠিন। এ কারণে দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে বৈঠকে ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদসহ আরও অনেকে।