প্রতাপ চৌধুরী:
ভারতীয় উপমহাদেশের সুদীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে দেবী দুর্গার আরাধনা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দুর্গাপূজা কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় আচার নয়; কালক্রমে এটি পরিণত হয়েছে শক্তি, ন্যায়, সত্য, সাহস, মানবিকতা ও শুভশক্তির বিজয়ের এক সর্বজনীন প্রতীকে। শরতের নির্মল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের বাদ্য যখন প্রকৃতিকে উৎসবমুখর করে তোলে, তখন বাঙালির হৃদয়ে জেগে ওঠে এক গভীর আবেগ—‘মা আসছেন’। এই ‘মা’ কেবল দেবী নন; তিনি দুর্গতিনাশিনী, বাঙালির চিরন্তন মমতা, আশ্রয় ও শক্তির প্রতীক।
‘দুর্গা’ শব্দের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক গভীর তাৎপর্য। যিনি দুর্গতি থেকে রক্ষা করেন, যিনি অশুভ ও বিপদের বিরুদ্ধে মানুষকে শক্তি জোগান, তিনিই দুর্গা। সনাতন ধর্মীয় দর্শনে দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তির প্রতীক। তিনি অকালবোধনের দেবী। পুরাণে বর্ণিত মহিষাসুরের অত্যাচার ও দেবতাদের অসহায়ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে দেবীর আবির্ভাব ঘটে। বিভিন্ন দেবতার শক্তির সম্মিলিত প্রকাশ হিসেবে দেবী দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য সম্মিলিত শুভশক্তির প্রয়োজন।
মহিষাসুরবধের পৌরাণিক কাহিনি তাই শুধু একটি ধর্মীয় উপাখ্যান নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানবসভ্যতার চিরন্তন নৈতিক শিক্ষা। মহিষাসুর প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় অহংকার, অত্যাচার, লোভ, হিংসা ও অন্যায়ের; আর দেবী দুর্গা প্রতীক হয়ে ওঠেন সত্য, ন্যায়, সাহস, সংযম ও কল্যাণের। যুগ পাল্টেছে, সমাজ পাল্টেছে, মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টেছে; কিন্তু এই প্রতীকের তাৎপর্য আজও অমলিন। মানুষের অন্তরে ও সমাজে যখনই অশুভশক্তির উত্থান ঘটে, তখনই প্রয়োজন হয় বিবেক, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার শক্তিকে জাগ্রত করার। দুর্গোৎসব সেই জাগরণেরই বার্তা বহন করে।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা নানা রীতি, আচার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। কোথাও তিনি মহিষাসুরমর্দিনী, কোথাও শক্তিরূপিণী, কোথাও আবার পরিবারের মঙ্গলময়ী জননী। তবে বাংলায় দুর্গাপূজা লাভ করেছে এক বিশেষ আবেগময় ও সামাজিক রূপ। বাঙালির কল্পনায় দেবী দুর্গা শুধু দশভুজা মহাশক্তি নন; তিনি ঘরের মেয়ে উমা। শরৎকালে সন্তানদের নিয়ে তিনি যেন পিতৃগৃহে ফিরে আসেন। সেখানে ফুটে ওঠে পারিবারিক মায়া-মমতার বন্ধন। তাই দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে একই সঙ্গে ধর্মীয় সাধনা, পারিবারিক আবেগ এবং সামাজিক মিলনের উৎসব।
দুর্গোৎসবকে ঘিরে যে সামাজিক আবহ সৃষ্টি হয়, তা বাংলার সংস্কৃতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। পূজামণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ, সেবামূলক কার্যক্রম—সবকিছুর সঙ্গে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্পৃক্ত হন। এই অংশগ্রহণ ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখাকে অনেক সময় অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনের জন্ম দেয়। উৎসবের আনন্দ তখন কেবল একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে।
বাংলার দুর্গাপূজার অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। বাংলার মাটি ঐতিহাসিকভাবেই বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের সাক্ষী। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, লোকসংস্কৃতি, সাহিত্য ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান দীর্ঘদিনের। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ পূজার আয়োজন, প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, নিরাপত্তা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে কুশল বিনিময় করেন।
একইভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও প্রতিবেশী মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক আনন্দের অংশীদার হয়েছেন। এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম মানুষের আত্মিক পরিচয়ের বিষয় হলেও মানবিকতা মানুষের সর্বজনীন পরিচয়। একজন মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তাই দুর্গোৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমার শিল্পকলা বা আলোকসজ্জার জৌলুশে নয়; এর সৌন্দর্য নিহিত মানুষের হৃদয়ের সংযোগে।
দুর্গাপূজা বাংলার শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও লোকসংস্কৃতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রতিমাশিল্প, মৃৎশিল্প, আলপনা, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচি নৃত্য, আগমনী গান এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন উৎসবকে দিয়েছে বহুমাত্রিক সৌন্দর্য। গ্রামবাংলার পূজা থেকে নগরীর বৃহৎ আয়োজন—সবখানেই স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে দুর্গোৎসবের এক গভীর মেলবন্ধন দেখা যায়। ফলে দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে বর্তমান সময়ে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্যকে শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত শিক্ষা অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়। আজকের পৃথিবীতে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য ও বিভাজনের নানা চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে উপস্থিত। এমন সময়ে দেবী দুর্গার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। অশুভকে পরাজিত করার অর্থ শুধু পৌরাণিক মহিষাসুরকে বধ করা নয়; আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অহংকার, লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতাকেও পরাজিত করা।
দুর্গোৎসব আমাদের আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানায়। দেবীর কাছে প্রার্থনা শুধু ব্যক্তিগত সুখ-সমৃদ্ধির জন্য নয়; প্রার্থনা হোক সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধির, দুর্বল ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর এবং সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য। যে উৎসব মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে, সেই উৎসবই প্রকৃত অর্থে মহৎ।
বাংলার দীর্ঘ ঐতিহ্য আমাদের শিখিয়েছে—সম্প্রীতি কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনচর্চার অংশ। একজনের ধর্মীয় উৎসবে অন্যজনের শুভেচ্ছা, আনন্দ ও সহযোগিতা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। তাই দুর্গাপূজার মণ্ডপ হোক সম্প্রীতির মিলনস্থল, উৎসব হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধার ক্ষেত্র এবং দেবীর আরাধনা হোক মানবিকতার সাধনা।
দেবী দুর্গা অশুভের বিনাশ ও শুভের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাঁর দশ হাতে ধারণ করা অস্ত্র যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শক্তি আমাদের সম্মিলিত চেতনার মধ্যেই নিহিত। আর তাঁর স্নেহময়ী মাতৃরূপ আমাদের দেখায় মমতা, সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসার মূল্য।
আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে তাই দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—ধর্ম যার যার, কিন্তু মানবতা সবার; বিশ্বাস যার যার, কিন্তু শান্তি ও সম্প্রীতি সবার। দেবী দুর্গার আগমনে আমাদের সমাজ থেকে দূর হোক অশুভ, হিংসা ও বিদ্বেষ; প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। বাংলার মাটির চিরন্তন সম্প্রীতির ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হোক, আর শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠুক মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধন আরও গভীর করার এক মহৎ উপলক্ষ।
এই হোক দেবী দুর্গার চরণে আমাদের প্রার্থনা—অশুভের বিনাশ হোক, শুভের জয় হোক; বিভেদের অবসান হোক, সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠা হোক; মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হোক সত্য, ন্যায়, মমতা ও মানবিকতার শক্তি।